ফয়সল আবদুল্লাহ
একসময় গ্রামে যোগাযোগ মানে ছিল চিঠি, হাট, আর বিকেলে চায়ের আড্ডা। নেতাদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরামর্শ পাওয়া যেত বড় কোনো সভা-সম্মেলনে। কিন্তু এখন? এখন গোটা গ্রাম বসে লাইভে। দর্শক শুধু পাশের পাড়া নয়, গোটা দেশ!
চীনের লিয়াওহ্য নদী থেকে শুরু করে ইয়াংজি ও হুয়াইহ্য উপত্যকার গ্রাম, আবার উত্তরের বরফঢাকা গ্রেটার সিং’আন পাহাড় পর্যন্ত—গ্রামীণ উন্নয়ন এখন আর শুধু মাঠে নয়, মোবাইলের স্ক্রিনেও ঘটছে। গ্রামগুলোতে এখন নতুন টুলকিট—স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর লাইভস্ট্রিমিং। সবচেয়ে মজার বিষয়—অনেক জায়গায় পার্টি সেক্রেটারি এখন একসঙ্গে কৃষক, পর্যটন গাইড আর কনটেন্ট ক্রিয়েটর!
থিয়েলিংয়ের হ্যচিয়াসিন গ্রামের প্রথম পার্টি সেক্রেটারি ৪৪ বছর বয়সী হু ইউমিং প্রতিদিন বিকেলে হাজির হন লাইভে। তার শো’র নাম না থাকলেও দর্শক সংখ্যা ঠিকঠাক। কখনও ঘাসভরা মাঠ দেখান, কখনও জলাভূমি, আবার কখনও বিপ্লবী ইতিহাসের গল্প শোনান—এ যেন রথ দেখা কলা বেচাকেনার পাশাপাশি একটুখানি ইতিহাসের ক্লাসও হয়ে গেল।
হু ইউমিংয়ের কৌশল হলো—গ্রামের সৌন্দর্য, ইতিহাস আর কৃষিপণ্য সব একযোগে ছড়িয়ে দেওয়া। ফলাফল? হাজার হাজার মানুষের কাছে চীনের গ্রামগুলো এখন ‘ডিজিটাল ট্যুরিস্ট স্পট’।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে, থিয়েলিংয়ের কর্তৃপক্ষ ১০০ জনেরও বেশি গ্রাম-পর্যায়ের সচিবদের জন্য নতুন মিডিয়া প্রযুক্তি এবং লাইভস্ট্রিমিং-এর মতো বিষয়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ সেশনের আয়োজন করে। লক্ষ্য ছিল অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের উৎসাহিত করা।
বেইশান গ্রামে ছেন চিয়ানকুও নামের আরেকজন পার্টি সেক্রেটারি লাইভে এসে বলেন— শুভ সন্ধ্যা বন্ধুরা। আমার লাইভস্ট্রিমে আপনাদের স্বাগত।
একটি সাধারণ লাইভস্ট্রিম শুরু হতেই ছেন তার কলার ঠিকঠাক করেন, ক্যামেরার সামনের টেবিলে রাখেন ঘরে তৈরি আচারের বয়াম বা এমন কোনো একটি পণ্য। ক্যামেরার সামনে সাবলীল আচরণের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যেই স্থানীয় ইন্টারনেট সেলিব্রিটিতে পরিণত হয়েছেন। বছরে আড়াই কোটি ইউয়ানেরও বেশি মূল্যের কৃষি পণ্য বিক্রি হয় তার লাইভস্ট্রিমে।
বেইশানের অর্থনৈতিক রূপান্তর চোখে পড়ার মতো, কারণ কয়েক বছর আগেও গ্রামটি কোনোমতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিল।
২০০৪ সালে যুবক বয়সে চেচিয়াং প্রদেশে উন্নত সুযোগের সন্ধানে বেইশান ছেড়েছিলেন ছেন। ২০১৫ সালের জুনে হ্যপেই-ফুচৌ হাই-স্পিড রেলপথ চালু হওয়ার পর গ্রামে ফিরে আসেন তিনি।
২০১৮ সালে বেইশান গ্রামের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন ছেন এবং এর এক বছর পর তিনি শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম তৌয়িনে অ্যাকাউন্ট খোলেন।
তার অনলাইন যাত্রার শুরুটা মসৃণ ছিল না। ছেন বলেন, গ্রামবাসী বলত যে আমি শুধু আমার ফোন দিয়ে ভিডিও বানাই। কেউ কেউ তো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও করেছিল।
এই ধরনের সংশয়ে হতাশ না হয়ে ছেন গ্রামবাসীকেও শর্ট ভিডিও তৈরিতে যুক্ত করেন এবং কৃষকদের জন্য মজার খেলাধুলার আয়োজন করেন, যাতে সবাই অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভিডিও তৈরির আনন্দ ও নতুনত্ব উপভোগের সুযোগ পায়।
আনহুই প্রদেশের মিংকুয়াংয়ের হ্যহুয়া গ্রামের উপ-পার্টি সম্পাদক ৪২ বছর বয়সী তিং চুন। একটি ছোট লাইভস্ট্রিমিং রুম ছিল তার। প্রাথমিকভাবে ওটা ছিল বিক্রয় প্লাটফর্ম। সেটাকেই তিনি পরিণত করেছেন একটি নীতি ব্রিফিং প্লাটফর্মে।
তিং জানালেন, ‘২০২৪ সালের অক্টোবরে লাইভস্ট্রিমিং শুরু করি। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামবাসীদের ফল ও স্থানীয় কৃষিপণ্য বিক্রিতে সাহায্য করা। তবে, আমার অনুষ্ঠান শুরুর পর, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, সামাজিক সহায়তা এবং বসতবাড়ি সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হচ্ছিল আমাকে।’
আর তাই তিং অবিলম্বে তার ক্যামেরার ফোকাসটা নিয়ে যান গ্রামবাসীদের জন্য সরকারি নথিপত্র ব্যাখ্যা করার দিকে। জটিল পদ্ধতিগুলোকে সহজ ধাপে ভেঙে বোঝাতে থাকেন তিনি।
তিং বলেন, ‘কাজটা সহজ নয়। কারণ এর জন্য আগে আমাকে প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝতে হয়।’
মানুষদের সাহায্য করার জন্য, তিং তাদের প্রশ্নগুলো লিখে রাখেন, এরপর সংশ্লিষ্ট স্থানীয় বিভাগগুলো থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তী লাইভস্ট্রিমিং সেশনে সেই তথ্যগুলো শেয়ার করেন। এ পর্যন্ত ৩০০টিরও বেশি লাইভস্ট্রিমিং সেশন করেছেন তিং চুন, যা ৩৪ হাজার অনুসারীকে আকৃষ্ট করেছে এবং যার মোট ভিউ সংখ্যা ১৬ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।
হ্যহুয়া গ্রামটি মিংকুয়াংয়ের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। ২০২৪ সাল থেকে, শহরটি গ্রামের ক্যাডার এবং পার্টি সদস্যদের লাইভস্ট্রিমিং কক্ষে প্রবেশ করে তাদের বক্তৃতা মাঠে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংগঠিত করেছে। স্থানীয় উপভাষা ব্যবহার করে, তারা কৃষকদের জন্য উপকারী নীতিগুলি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন।
চীনের কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহকারীরাও লাইভস্ট্রিমিং সেশনে যোগ দিয়েছেন, যেখানে তারা ধাপে ধাপে বিভিন্ন কৌশল শেখাচ্ছেন এবং কৃষকদের সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন।
এই বছর, মিংকুয়াংয়ে নানা ধরনের তাত্ত্বিক বক্তৃতার ওপর ১২১টি ছোট ভিডিও প্রকাশ করেছে। শহরটি ১৮০টিরও বেশি বক্তৃতা লাইভস্ট্রিম করেছে, যার প্রতিটি পেয়েছে হাজারের বেশি ভিউ।
২০২০ সালের শুরুতে, তু বো উত্তর-পূর্ব চীনে সাংস্কৃতিক পর্যটনের পুনরুজ্জীবনের একটি প্রাণবন্ত গল্প তৈরি করেন, যখন তিনি স্থানীয় উপভাষায় মহামারি প্রতিরোধের উপর একটি ছোট ভিডিও তৈরি করেন।
ভিডিওটি যখন সাড়ে সাত লাখ ভিউ পায়, তু তখন হেইলংচিয়াং প্রদেশের তাহ্য কাউন্টির সংস্কৃতি ও পর্যটন ব্যুরোর পরিচালক। প্রথমবারের মতো নতুন মিডিয়ার শক্তিশালী প্রভাবের সম্মুখীন হন তিনি।
সিএমজি বাংলা