সিচাংয়ের যাযাবর পরিবারের মেয়ে এখন চীনের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে

ফয়সল আবদুল্লাহ

চীনের সবচেয়ে উঁচু শহর নাগছুর এক পশুপালক পরিবারের মেয়ে পেমা লামো। দুর্গম মালভূমি থেকে এগিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। প্রায় ৪ হাজার মিটার উঁচু পাহাড়ি গ্রামের এই তরুণী চায়না ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়ামে ভর্তি হয়েছেন। প্রশাসনের শিক্ষা সহায়তা ও আবাসিক স্কুল ব্যবস্থার কারণে নাগছুর মতো দুর্গম এলাকার আরও অনেক শিক্ষার্থী পাচ্ছে উন্নত শিক্ষার সুযোগ। পেমার এই সাফল্য এখন তার পরিবার ও সম্প্রদায়ের জন্য হয়ে উঠেছে আশার প্রতীক।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার মিটার উঁচুতে চীনের সিচাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নাগছুর একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। সেখানেই বড় হয়েছেন পেমা লামো। এক যাযাবর পশুপালক পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যা তিনি। সম্প্রতি চীনের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চায়না ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়ামে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তার এই অর্জন উদযাপন করতে পরিবারের সদস্যরা তাকে শুভকামনার প্রতীক ঐতিহ্যবাহী সাদা খাদা পরিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

পেমা লামো বললেন, ‘ফল প্রকাশের দিনও আমি নির্মাণকাজে ব্যস্ত ছিলাম। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আর আমি বারবার ওয়েবসাইটে ফল দেখছিলাম। গভীর রাতে যখন জানতে পারলাম আমি চায়না ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়ামে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি, আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম।’

পেমা লামোর মা-বাবা ইয়াক পালন করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পেমা। তার বড় বোন লাজমও এখন সিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। মেয়ের পড়াশোনার জন্য মা-বাবাকে কয়েকটি ইয়াক বিক্রি করে কাউন্টির আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়েছিল। তিন বছরের আবাসিক স্কুল জীবনই পেমাকে গড়ে তোলে আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর করে। পরে লাসার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কঠোর পরিশ্রমেই সুযোগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার।

পেমার বড় বোন লাজমও পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বোনো সাফল্যে গর্বিত লাজম বললেন, ‘পেমা আমাদের পরিবারের সবচেয়ে ছোট। কিন্তু সে সবসময় বাবা-মায়ের কথাই আগে ভাবে। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন কাঁদিনি। কিন্তু ওর ভর্তি হওয়ার খবর শুনে আনন্দে চোখে পানি চলে এসেছিল।’

মেয়েদের এই সাফল্যে আবেগাপ্লুত তাদের বাবা সোটসে। তিনি বলেন, তাদের শৈশবে এলাকায় স্কুল ছিল খুবই কম, যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল দুর্বল। তখন পুরো এলাকায় হয়তো একজন বা দু’জন শিশু মাত্র বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পেত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে পেমা লাসায় ফিরে গিয়ে তার শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার গ্রামের বাড়ি থেকে লাসা পৌঁছাতেও গাড়িতে সময় লাগে প্রায় ১২ ঘণ্টা।

লাসা নাগছু নম্বর ২ হাই স্কুলের উপ-প্রধান শিক্ষক লবসং জানালেন, ‘নাগছুর অনেক কৃষক ও পশুপালক পরিবারের সন্তান আগে মানসম্মত শিক্ষা পেত না। এই আবাসিক বিদ্যালয়ে তাদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন এবং শিক্ষার্থীরা পুরো মনোযোগ পড়াশোনায় দিতে পারে।’

দুর্গম ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ২০০৪ সালে সিচাংয়ে বিশেষ আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে চীন সরকার। নাগছু ও নগারির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীদের সেখানে ভর্তি করানো হয়, যাতে তারা উন্নত শিক্ষার সুযোগ পায়।

তথ্যসূত্র: সিএমজি

china