ব্রিটেনের শিল্পনগরী লুটনের ভক্সহল গাড়ি উৎপাদন কারখানাটি ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানকার সাবেক কর্মীদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। কয়েক দশক ধরে শহরটির অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই কারখানাটি বন্ধের ফলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই ২০ থেকে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে সেখানে কর্মরত ছিলেন। কারখানাটি টিকিয়ে রাখতে শ্রমিকরা উৎপাদন খরচ কমানোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগে সহযোগিতা করলেও, মূল প্রতিষ্ঠান স্টেলান্টিসের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়।
ট্রেড ইউনিয়ন ইউনাইটের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কারখানা বন্ধের এক বছর পরও প্রায় ৩০ শতাংশ সাবেক কর্মী বেকারত্বের শিকার। যারা নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছেন, তাদের অনেকেরই আয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মালিক মাহমুদ নামের এক সাবেক কর্মীর অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়; ২৬ বছর ভক্সহলে কাজ করার পর চাকরি হারিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় নতুন কাজের সন্ধানে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত একটি গুদামে কাজ পেলেও তার মাসিক আয় আগের চেয়ে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড কমে গেছে। বয়সের কারণে নতুন চাকরি পাওয়া তার জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারখানা বন্ধের এই প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং শ্রমিকদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ইউনাইটের জরিপ অনুযায়ী, একসময় লেবার পার্টির প্রতি শ্রমিকদের যে সমর্থন ছিল, তা এখন তলানিতে ঠেকেছে। চলতি বছরের বসন্তের তথ্যমতে, ১০ শতাংশেরও কম শ্রমিক এখন লেবার পার্টিকে সমর্থন করেন। এর বিপরীতে ৫০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
শ্রমিকদের এই ক্ষোভের মূল কারণ হলো প্রচলিত রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নের প্রতি তাদের আস্থার সংকট। তাদের অভিযোগ, সংকটের মুহূর্তে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। একসময় ভক্সহল ব্রিটেনে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষকে সরাসরি কর্মসংস্থান দিত। এই কারখানাটি ঘিরে বহু পরিবার তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজিয়েছিল, কিন্তু এখন সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। স্থায়ী ও ভালো বেতনের চাকরির পরিবর্তে এখন অনিশ্চিত ও স্বল্প বেতনের কাজের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে অনেককে।
বিশ্লেষকদের মতে, লুটনের এই পরিস্থিতি ব্রিটেনের সামগ্রিক শিল্প অবক্ষয়ের একটি বড় উদাহরণ। স্কটল্যান্ডের গ্র্যাঞ্জমাউথ থেকে ওয়েলসের পোর্ট ট্যালবট পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একই ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সাবেক শ্রমিকদের মতে, পুরনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। একসময় হাজারো মানুষের কর্মমুখর এই কারখানা প্রাঙ্গণ এখন এক বিশাল ‘শূন্যতা’য় পরিণত হয়েছে। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক শূন্যস্থানই রিফর্ম ইউকের মতো রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাবেক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের হতাশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লুটনের ভক্সহল কারখানা একসময় শুধু কর্মসংস্থানের কেন্দ্র ছিল না; শহরটির সামাজিক জীবন ও পরিচয়ের সঙ্গেও এটি জড়িয়ে ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারখানাকে ঘিরে বহু পরিবার বাড়ি কিনেছে, সন্তানদের শিক্ষা দিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছে। চাকরির আরও তথ্য: তাঁদের মতে, ভালো বেতন, পেনশন ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকা স্থায়ী চাকরির জায়গায় এখন অনিশ্চিত ও কম বেতনের কাজ বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেক পরিবারকে জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে খাবার ও ঘর গরম রাখার খরচ পর্যন্ত কাটছাঁট করতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ডানপন্থি ও কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তি সমর্থন বাড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।