গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীজুড়ে ভোগান্তি যেন কমছেই না। প্রতিদিন কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতেই কেটে যাচ্ছে। কখনো আবার গ্যাস না পেয়ে খালি গাড়ি নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যাত্রী পরিবহণ কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি সংগ্রহেই নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়। ফলে নির্ধারিত জমার টাকা তুলতে পারছেন না অনেক সিএনজি চালক। আয় কমে গিয়ে সংসার চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং চালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
মিরপুর ১২ নম্বর ইনট্রাকো ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকার চালক মুন্না বলেন, ১৬০ টাকার গ্যাস ভরেছি। এই গ্যাস দিয়ে কী হবে, বড় জোর ২ ট্রিপ মারা যাবে। গত কয়েক দিন ২-৩ বার পাম্পে আসতে হয়েছে, আজও আসা লাগবে। সিএনজি চালক রাজু মিয়া বলেন, আধা ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করে ৪০-৫০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে মালিকের জমা ও সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। একই স্টেশনে অপেক্ষমাণ সিএনজিচালক আলমগীর বলেন, গতকাল শুধু ৬০ টাকার গ্যাস পাইছি। ওই গ্যাস দিয়া এক হাজার টাকা ভাড়া মারছি, জমা ১২০০ টাকা। মালিকই খাবে কী, আর আমিই খামু কী।
মঙ্গলবার সকাল থেকে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশে খন্দকার ফিলিং স্টেশনের অপারেটর মনির বলেন, আমাদের কাছেই যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কীভাবে গ্যাস দেব? গত দুই সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। আমাদের পাম্প একেবারে বন্ধ রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর এলাকার আরএসআর ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী জানে আলম জানান, পাঁচ-ছয় দিন ধরে এই সমস্যা চলছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন জোন-৯-এর ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল আজিম জানান, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এই সংকট দেখা দিয়েছে।
ডেমরার রাসেল ফিলিং ও সিএনজি স্টেশনে এবং হাজী সিএনজি ফিলিং স্টেশনে মঙ্গলবারও দিনভর সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাস না থাকার কারণে রাসেল ফিলিং স্টেশন চারটি হোসের মধ্যে মাত্র ১টি সচল রাখতে পারছে। মীরপাড়া এলাকায় অবস্থিত হাজী ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস পেতে যানবাহন চালকরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অনেকে ফিরে যাচ্ছেন। সেখানেও প্রেশার ফল করায় ১ হোস পাইপ লাইন দিয়ে গ্যাস ফিলিং করতে হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরায় গ্যাস নিতে আসা সিএনজিচালক মো. সারোয়ার আরিফ জানান, আমরা কি পরিবারসহ না খেয়ে মরব?
রাজধানীর মহাখালীর আরজতপাড়া, বাসস্ট্যান্ড, নাবিস্কো, তেজগাঁও ও সাতরাস্তার মোড় এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় লম্বা লাইন দেখা গেছে। রাজধানীর সবচেয়ে সচল সাতরাস্তা মোড়ের আকিজ সিএনজি স্টেশনটি ৪/৫ দিন ধরে গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে বলে দায়িত্বে নিয়োজিত গার্ড ও নজেলম্যানদের সাথে কথা বলে জানা যায়। আরজতপাড়া ইউরেকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সবে মাত্র ৫০ টাকার গ্যাস পেলেন মিরপুর থেকে আসা সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক রানা। তিনি বলেন, এ রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ পরে মাত্র ৫০ টাকার গ্যাস পেলাম। এ অবস্থায় কেমনে কি করব মাথা কাজ করছে না।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার এবিএন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার শহীদুল জানান, গ্যাসের চাপ এত কম যে কোনরকম কিছুক্ষণ সরবরাহ করার পর অটো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মালিবাগ, মুগদা বিশ্বরোড, মতিঝিল, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও গোড়ানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গ্যাস সংকটের একই চিত্র দেখা গেছে। মালিবাগ হাজীপাড়া সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশন, বিশ্বরোডের শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, আরকে মিশন রোডের এন.এস. সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার এবং মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার কোনো কোনো স্টেশনে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।