ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান বিন হাদিকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় তদন্তে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন থানাধীন বক্স কালভার্ট রোডে পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র হামলায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ই ডিসেম্বর রাত ১০টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শরীফ ওসমান হাদি।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে। তার নির্দেশনায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ প্রধান শুটার হিসেবে এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখ মোটরসাইকেল চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফয়সাল ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। আলমগীরও আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির চলাচল, নিরাপত্তাবলয় ও নিয়মিত কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করছিল। ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে প্রবেশ করেন। এরপর দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল ৭.২ বোরের রিভলবার দিয়ে তাকে গুলি করে। হামলার আগে ও পরে যোগাযোগের জন্য তারা একাধিক মোবাইল নম্বর, হ্যান্ডসেট ও আইএমইআই ব্যবহার করেছিল।
পরিকল্পনাকারী বাপ্পী ঘটনার আগেই গত ২০২৫ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে মো. মহিদউদ্দিন চৌধুরী নামে ভারতীয় আধারকার্ড ও প্যানকার্ড সংগ্রহ করেছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীর মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে বিশেষ টাস্কফোর্স।
তদন্তে জানা গেছে, ফয়সাল ও আলমগীরের সীমান্ত পারাপার ও ভারতে আশ্রয় নিতে ফিলিপ সাংমা নামে এক ভারতীয় নাগরিক এবং স্থানীয় চোরাকারবারিরা সহায়তা করেছিল। এদিকে, ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীনকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং অস্ত্র ও আলামত গোপনের পাশাপাশি অর্থায়নে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার ২১ দিনের মধ্যে ডিবি পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে মূল পরিকল্পনাকারী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করার অভিযোগে আদালতে নারাজি আবেদন করা হয়। আদালত পরবর্তীতে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিতে হস্তান্তর করে। বর্তমানে ভারতের মাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি, নথির গ্রহণযোগ্যতা এবং অপরাধের সামঞ্জস্য বিধানের মতো আইনি জটিলতায় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিচার ও প্রত্যর্পণে দীর্ঘসূত্রিতা অব্যাহত থাকলে বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ইনকিলাব মঞ্চের দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের ফাঁসি এবং নেপথ্যের কুশীলবদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সমন্বিত আইনি উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিআইডি বর্তমানে হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা ও অর্থায়নের উৎস শনাক্তে কাজ করছে। বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা এবং খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দাপ্তরিক নথির আদান-প্রদান ও আদালতকেন্দ্রিক সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। হাদির পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মঞ্চের পক্ষ থেকে এই বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন কর্মসূচির বার্তাও দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিচারে বিলম্ব হলে এটি বিরোধী দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে যা সরকার বিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে পারে এমন পূর্বাভাসও দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়ে তার এই হত্যাকাণ্ড রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আহত অবস্থায় হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অস্ত্র সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়, পালানোর প্রস্তুতি এবং হামলার আগের রাতে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর ও সাভার এলাকায় কয়েকজনের সন্দেহজনক চলাচলের তথ্যও উঠে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতের কাছ থেকে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, সীমান্ত পারাপার ও সহযোগীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তথ্য পেতে বিলম্ব হওয়ায় সিআইডি’র প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে এবং সর্বশেষ ২০শে আগস্ট তারিখ থাকলেও প্রতিবেদন জমার তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারতে আসামিদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা, ভারতীয় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য আইনি আপত্তির কারণে তাদের প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত হচ্ছে বলে সর্বশেষ তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্তমানে তিনি সেখানে নাম পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আধারকার্ড ও প্যানকার্ড গ্রহণ করে কলকাতার খিদিরপুরে অবস্থান করছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন।