প্রেক্ষাপট: হিন্দু ও মুসলমান কেন ’৪৭-কে ভিন্নভাবে স্মরণ করে

ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার ৭৯ বছর পার হলো গত আগস্টে। যদিও প্রকৃত বিভাজন বুঝতে হলে তখনকার এবং বর্তমানের মানচিত্রের দিকে তাকাতে হয়, আর প্রথম বিভাজনের সেই মানচিত্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পর আরও বদলে গেছে, তবু সেই বিভাজনের ইতিহাস এবং মানুষের ওপর তার প্রতিক্রিয়া জানা জরুরি। ১৯৪৭ সালের বিভাজন আক্ষরিক অর্থে পুরো ভারতকে টুকরো টুকরো করেনি, তবে ভারতের দুটি বৃহৎ অঞ্চলকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। এই বিভাজনের শিকার হয়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাব। বিভক্ত হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত এই দুই অঞ্চলের মানুষের মনে ফেলে আসা মাটির জন্য এক গভীর টান রয়ে গেছে।

দেশভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পরিসংখ্যান

  • দেশভাগ ১৯৪৭: ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত আঁকার গল্প।
  • ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২: একুশের হয়ে ওঠা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কাল।
  • অখণ্ড বঙ্গের আয়তন: ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ৭৭ হাজার ৪৪২ বর্গমাইল।
  • পূর্ববঙ্গের ভূখণ্ড: প্রায় ৪৯ হাজার ২৫৯ বর্গমাইল (মোট আয়তনের প্রায় ৬৪ শতাংশ)।
  • পশ্চিমবঙ্গের ভূখণ্ড: প্রায় ৩৬ শতাংশ।
  • আয়তনের অনুপাত: পূর্ববঙ্গ পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় প্রায় ১.৭৫ গুণ বড় ছিল।
  • পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা: হিন্দু ২৮ শতাংশ এবং মুসলমান ৭০ শতাংশ।
  • পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা: হিন্দু ৬৫ শতাংশ এবং মুসলমান ৩০ শতাংশ।
  • পুরো বঙ্গের জনসংখ্যা: হিন্দু ৪২-৪৩ শতাংশ এবং মুসলমান ৫৪-৫৫ শতাংশ।
  • সিলেটের অবস্থান: তখন আসামের অংশ ছিল, গণভোটের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গে যুক্ত হয়।

যদিও এই স্মরণবেদনা বা নস্টালজিয়া আজকের প্রজন্মের থাকার কথা নয়, তবু প্রায়ই সাহিত্য ও সিনেমায় হারিয়ে যাওয়া সেই স্মৃতির পুনরুত্থান দেখি। পাঞ্জাব থেকে চলে আসা উদ্বাস্তুদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাবেক পৈতৃক নিবাস নিয়ে প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। অনেকে একবার হলেও পূর্বপুরুষের ভিটা দেখে আসতে চান। একইভাবে পূর্ববঙ্গের সাবেক অধিবাসীদের মধ্যেও নিজেদের পিতৃভূমি নিয়ে গভীর স্মরণবেদনা রয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই স্মরণবেদনা কি স্বাভাবিক? শুধু কি পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া মানুষই এই বেদনায় ভোগেন, নাকি যাঁরা ভারত ছেড়ে পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যেও এ ধরনের অনুভূতি রয়েছে?

র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদ বঙ্গকে অসমভাবে বিভক্ত করেছিল। এই বিভাজন নির্ভর করেছিল ‘অখণ্ড বঙ্গ’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল তার ওপর। সহজ ভাষায় বললে, বঙ্গভাগের আগে প্রতি ১০০ বর্গমাইলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ ছিল ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশ আর পূর্ববঙ্গের ভাগ ছিল ৬৪ থেকে ৬৫ শতাংশ। এই বিশাল ভূখণ্ড হারানোর বেদনা এবং দেশান্তরী হওয়ার অভিজ্ঞতা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

অভিবাসন ও স্মৃতির ভিন্নতা

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বঙ্গভাগের পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ হিন্দু পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে চলে আসেন। পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরে এই সংখ্যা ৬০ লাখে পৌঁছায়। তুলনামূলকভাবে, ১৯৪৭ সালের পর ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অনেক মুসলমান ১৯৫১-৫২ সালের দিকে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। এই অসম অভিবাসনই দেশভাগের স্মৃতিকে ভিন্ন রূপ দিয়েছে।

বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে পূর্ববঙ্গকে একটি হারানো স্বদেশ হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি। তাঁদের কাছে পূর্ববঙ্গের গ্রাম, পুকুর, খেত ও মন্দির পবিত্র স্মৃতির আধার হয়ে উঠেছে। সাহিত্যের পাতায় বারবার এই হারানো স্বদেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে আবেগটি ছিল ভিন্ন। তাঁদের কাছে ১৯৪৭ মানে ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান, হিন্দু অভিজাত শ্রেণির আধিপত্য থেকে মুক্তি এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একটি নতুন স্বদেশের জন্ম। যদিও ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ তাঁদের সেই আবেগের জায়গাটি বদলে দিয়েছিল, তবুও দেশভাগের প্রাথমিক অনুভূতিটি হিন্দুদের তুলনায় ভিন্ন ছিল।

হিন্দুদের আক্ষেপের তীব্রতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, ব্যাপক হারে উদ্বাস্তু হওয়া এবং স্থায়ীভাবে ভিটা ছাড়া হওয়া। দ্বিতীয়ত, হারানো বাড়ি ও গ্রামকে সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ করে তোলা। তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যাওয়া। এই প্রতিটি কারণই দেশভাগের স্মৃতিকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে।

র‍্যাডক্লিফের মানচিত্র আঁকার সময় যে বিষাদের ছায়া ছিল, তা আজও দুই বাংলার মানুষের মনে কোনো না কোনোভাবে রয়ে গেছে। দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারণ ছিল না, এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও পরিচয়ের আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের প্রভাব আজও আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত স্মৃতির গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটিকে সাধারণত এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পুরো বঙ্গের হিসাবে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ এবং মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখন দেখা যাক, ১৯৪৭ সালের বঙ্গভাগ দুই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছিল বিহার প্রদেশ থেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখায়, বাঙালি হিন্দুরা, বিশেষত পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু উদ্বাস্তুরা বঙ্গভাগ নিয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বেদনা বহন করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এর অর্থ এই নয় যে বাঙালি মুসলমানরা কোনো কষ্ট বা অনুশোচনা অনুভব করেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই ব্যাপক উচ্ছেদ একটি শক্তিশালী স্মৃতি-সংস্কৃতি তৈরি করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হারানোর বেদনা।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ প্রশ্নগুলো নিয়েই আমার কিছু ভাবনা। এ লেখা সে ভাবনারই কিছু ফসল।
১৯৪৭ইতিহাসউদ্বাস্তুদেশভাগপশ্চিমবঙ্গপূর্ববঙ্গস্মৃতি