চোং আরের ৪৫ কিলোমিটার পিছু হটা: রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সততা ও আন্তরিকতার শিক্ষা

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

চীনের জনগণ বরাবরই বিশ্বাসযোগ্যতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। শুধু ব্যক্তিজীবনে পালনীয় একটি মহৎ গুণ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতির অংশ হিসেবেও তারা সততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টিকে বিবেচনা করে। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের চর্চায় ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ চীনা জনগণের চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি চীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। আজ আমরা শুনব বসন্ত-শরৎ যুগের চিন রাজ্যের শাসক চোং আরের দেওয়া কথা রাখার এক অনন্য কাহিনি—যেখানে প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ৪৫ কিলোমিটার পিছু হটেছিলেন।

 

চোং আর (খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯৭–৬২৮) ছিলেন চিন রাজ্যের এক রাজপুত্র। রাজা হওয়ার আগে তাকে বেশ কিছুদিন নির্বাসনে কাটাতে হয়েছিল। নির্বাসনকালে চু রাজ্যের রাজা তাকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করেন এবং সম্মানিত অতিথির মর্যাদা দেন। একদিন চু রাজা চোং আরের সম্মানে এক ভোজের আয়োজন করেন। খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে আলাপ হয়। একপর্যায়ে চু রাজা তাকে প্রশ্ন করেন, ‘কোনো দিন যদি আপনি চিনে ফিরে গিয়ে রাজা হন, তাহলে আমাকে কীভাবে প্রতিদান দেবেন?’

চোং আর কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দেন, ‘দাস-দাসী, মূল্যবান রত্ন ও রেশম—এসবই আপনার রাজ্যে রয়েছে। হাতির দাঁত, পশুচর্ম ও দুর্লভ পাখির পালকের মতো মূল্যবান সামগ্রীও চু রাজ্যের নিজস্ব উৎপাদন। চিন রাজ্যের এমন কী সম্পদ আছে, যা দিয়ে আপনাকে প্রতিদান দিতে পারি, তা ভেবে পাচ্ছি না।’

চু রাজা বলেন, ‘আপনি যা বললেন, সেসব তো আমার রাজ্যেই রয়েছে। কিন্তু যদি সত্যিই প্রতিদান দিতে চান, তাহলে কীভাবে দেবেন?’

চোং আর জবাব দেন, ‘যদি কোনো দিন চিন রাজ্যের রাজা হতে পারি, তাহলে অবশ্যই আপনার রাজ্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করব। আর কখনও যদি দুই রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ বাধে, তবে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে আমি আমার সেনাবাহিনীকে তিন শিবির পিছু হটার নির্দেশ দেব (প্রাচীনকালে এক শিবির ছিল ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব)। এরপরও যদি আপনি সন্ধিতে রাজি না হন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান, কেবল তখনই আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’

দুই রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ কোনো সামান্য বিষয় নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সামান্য পিছু হটাও কখনও কখনও বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে হারাতে হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, কমে যেতে পারে সৈন্যদের মনোবল, এমনকি নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে যুদ্ধের জয়-পরাজয়। এমন পরিস্থিতিতে চোং আরের এই প্রতিশ্রুতি ছিল তার আন্তরিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার এক বিরল দৃষ্টান্ত।

পাঁচ বছর পর চু ও চিন রাজ্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং দুই পক্ষ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তত দিনে চোং আর চিনে ফিরে গিয়ে সিংহাসনে বসেছেন। চু রাজ্যের সেনাপতি বিশাল বাহিনী নিয়ে চিন আক্রমণ করলে চোং আর তার সেনাদের পিছু হটার নির্দেশ দেন। চিনের বাহিনী একের পর এক পিছু হটে শেষ পর্যন্ত তিন শিবির, অর্থাৎ প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে অবস্থান নেয়।

চিনের কিছু সৈন্য এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা অভিযোগ করে, ‘আমাদের রাজা নিজেই যখন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন আমরা যুদ্ধ না করেই কেন পিছু হটছি? একবার নয়, বারবার পিছু হটতে হচ্ছে! এটি তো আমাদের জন্য অপমানজনক।’

এ সময় চিন রাজ্যের মন্ত্রী জি ফান—যিনি হু ইয়েন নামেও পরিচিত—সৈন্যদের সামনে এসে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি ছিলেন রাজা ওয়েন, অর্থাৎ চোং আরের মামা। চোং আরের সঙ্গে তিনিও ১৯ বছর নির্বাসনে কাটিয়েছিলেন। পরে চিন রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং রাজ্যটির শক্তি দ্রুত বাড়াতে সহায়তা করেন।

জি ফান বলেন, ‘আপনারা বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। আমাদের রাজা একসময় চু রাজার কাছ থেকে আন্তরিক আতিথেয়তা পেয়েছিলেন। তখন তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দুই রাজ্যের সেনাবাহিনী কখনও যুদ্ধে মুখোমুখি হলে চিনের বাহিনী তিন শিবির পিছু হটবে। আজ রাজা সেই প্রতিশ্রুতিই পালন করছেন। তিনি যদি নিজের কথা না রাখেন, তাহলে অন্যায় আমাদের দিকেই থাকবে। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সদিচ্ছাও প্রকাশ করেছি। এরপরও যদি চু রাজ্য আক্রমণ চালিয়ে যায় এবং আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন আমরা যুদ্ধ করতে পারি।’

চিনের বাহিনী ৪৫ কিলোমিটার পিছু হটার পরও চু রাজ্যের সেনারা আক্রমণ অব্যাহত রাখে। ফলে শেষ পর্যন্ত চিনের বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং জয়লাভ করে। এভাবেই রাজা চোং আর যুদ্ধক্ষেত্রেও নিজের দেওয়া কথা রেখেছিলেন। তার সততা ও প্রতিশ্রুতি পালনের দৃষ্টান্ত অন্য রাজ্যগুলোর কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে অনেক রাজ্য তার সঙ্গে মিত্রতা ও সহযোগিতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। এভাবেই চিন রাজ্যের প্রভাব ও শক্তি আরও বিস্তৃত হয়।

চীনা জনগণ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রবণতা তাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ১৯৬৩ সালে মিসরের অতিথিদের সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বলেছিলেন, বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় চীনারা যে কিছু দার্শনিক চিন্তা অনুসরণ করে, তার উৎস চীনের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তার ভাষায়, ‘আমরা চীনারা এসব দার্শনিক চিন্তার ভিত্তিতে কাজ করি। আর এই চিন্তাগুলো আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য থেকে এসেছে; সবটাই মার্কসবাদ-লেনিনবাদী শিক্ষা নয়।’

চৌ এনলাইয়ের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, চীনের ঐতিহ্যবাহী দর্শন দেশটির কূটনৈতিক চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। চোং আরের তিন শিবির পিছু হটার ঘটনা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে আন্তরিকতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। এটি চীনা জাতির দীর্ঘদিনের লালিত নৈতিক আদর্শেরও প্রতিফলন।

সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও আন্তরিক আচরণ চীনের কূটনৈতিক চর্চার অন্যতম মৌলিক নীতি। চীন ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। মালয়েশিয়া ছিল আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম, যারা চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দেশের পারস্পরিক কল্যাণমূলক সহযোগিতা ক্রমাগত গভীর হয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে এবং অর্জিত হয়েছে নানা সাফল্য।

দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পেছনে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও আন্তরিকতার ভূমিকা রয়েছে। ২০১৩ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং মালয়েশিয়া সফরকালে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক নিজের বাসভবনে এক ভোজসভার আয়োজন করেন। সেখানে নাজিব বলেন, তার বাবা চীন-মালয়েশিয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন, কারণ চীনের নেতারা সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেন। নাজিব নিজেও চীনকে মালয়েশিয়ার একজন বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে বিবেচনা করেন বলে জানান। তিনি প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে একজন বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু উল্লেখ করে দুই দেশের বন্ধুত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার গুরুত্ব তুলে ধরে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং আন্তরিক আচরণের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে—যা দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

চীনের কূটনীতিতে প্রতিশ্রুতি রক্ষার এই নীতির শিকড় দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত। এটি কেবল তাৎক্ষণিক স্বার্থের হিসাবের বিষয় নয়; বরং চীনা সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে লালিত একটি মূল্যবোধ। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—‘কথা দিলে তা রাখতে হবে, কাজ শুরু করলে তা শেষ করতে হবে।’ এই পরিচিত শিক্ষার মধ্য দিয়ে সততার সঙ্গে জীবনযাপন এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার ধারণা তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়।

কথা রাখার এই ঐতিহ্য চীনের কূটনীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে দেশটি মনে করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে চীন আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে আসছে। আফ্রিকার উন্নয়নে সহায়তা, জাতিসংঘের প্রতি অঙ্গীকার, অনুন্নত অঞ্চলগুলোর উন্নয়নে সহযোগিতা এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন—এসব ক্ষেত্রকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন আন্তরিকতা, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে।

চীনের প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও আন্তরিক আচরণের কূটনৈতিক বৈশিষ্ট্য দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই চীনের কূটনীতি বুঝতে হলে একে দেশটির পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পুষ্টিতে দেশটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে একটি কূটনৈতিক ধারা গড়ে তুলেছে—যার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিশ্রুতি পালনের নীতিকে তুলে ধরা হয়।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা