Saturday, March 29

ইফতার আয়োজনে রাজশাহী কলেজ শিক্ষার্থীদের সৌহার্দ্যময় মিলনমেলা

মোঃ আব্দুল আলিম :  বসন্তের শেষ স্পর্শটুকু মিলিয়ে যেতে না যেতেই রাজশাহী কলেজের আকাশে-বাতাসে নেমে এসেছে রমজানের পবিত্র আবহ। গ্রীষ্মের দাবদাহ উপেক্ষা করেও শিক্ষার্থীদের মাঝে রমজানের স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে, যা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে তাদের সৌহার্দ্যময় ইফতার আয়োজনে। একসঙ্গে বসে ইফতার করা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। রাজশাহী কলেজের মাঠ, যা বছরের অন্যান্য সময়ে কোলাহলে মুখর থাকে, সেই মাঠই এখন শিক্ষার্থীদের ইফতার আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নানা ব্যাচের, নানা বিভাগের শিক্ষার্থীরা একত্রে বসে ইফতার করছেন, ভাগাভাগি করছেন খাবারের সাথে আনন্দ, সুখ-দুঃখের গল্প, আর একে অপরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

রমজান আত্মশুদ্ধির মাস, সংযম ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। তবে এটি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার এক উত্তম সুযোগ। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষা বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন।

শিক্ষার্থীদের ইফতার আয়োজনে অংশ নেওয়া অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খালিদ বলেন,

রমজানের সময়টা এমনিতেই অনেক পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে যখন বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে ইফতার করা হয়, তখন সেটা শুধুমাত্র একটি খাবার গ্রহণের বিষয় থাকে না। এটা আমাদের সম্পর্কের আরও গভীরতা এনে দেয়। সিনিয়র-জুনিয়র সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করা এটি আমাদের পরিবারতুল্য এক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। রমজানের মূল শিক্ষা হলো ধৈর্য, সংযম, এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতি। আমরা যখন সবাই একসঙ্গে ইফতার করি, তখন শুধু খাবার ভাগাভাগি হয় না, বরং ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সৌহার্দ্য ভাগাভাগি হয়। বহু শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা রাজশাহী কলেজে পড়তে এসে পরিবার থেকে দূরে থাকেন। তাদের কাছে এই ইফতার আয়োজন যেন এক নতুন পরিবারের সন্ধান এনে দেয়।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলেন,

আমি ঢাকার ছেলে, পরিবার ছেড়ে এখানে থাকি। রমজানে বাড়িতে ইফতার করার আনন্দটাই আলাদা, কিন্তু রাজশাহী কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করতে এসে সেই শূন্যতা আমি একদমই অনুভব করি না। এটা আমাদের দ্বিতীয় পরিবার, যেখানে সবাই মিলে একসঙ্গে ইফতার করি, খুশি ভাগ করে নেই।

শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই নয়, এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও, যা রাজশাহী কলেজের অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল নিদর্শন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক হিন্দু শিক্ষার্থী মানিক বলেন, রমজান মানে শুধু রোজা রাখা নয়, এটি সম্প্রীতিরও প্রতীক। আমি নিজেও ইফতারের সময় বন্ধুদের সঙ্গে বসি, তাদের আনন্দের অংশীদার হই। রাজশাহী কলেজ সবসময়ই অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদাহরণ।

এই ইফতার আয়োজনে শুধু শিক্ষার্থীরাই অংশ নেননি, বরং অনেক শিক্ষক এবং সিনিয়র শিক্ষার্থীও এসেছেন, যারা তাদের স্নেহ, অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে উৎসাহিত করেছেন। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়েছেন ইফতারের পবিত্রতা ও সৌন্দর্য্য রক্ষা করতে। রাজশাহী কলেজের ইফতার আয়োজন যে শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ তা নয়, এটি আরও বড় কিছু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন হওয়া উচিত তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে, রাজশাহী কলেজ কেবল একাডেমিক শিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চারও আদর্শ স্থান। ইফতারের এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মিক বন্ধন গড়ে তুলেছে, যা শুধু রমজান মাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।

এই ইফতার আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেয়, সম্প্রীতি ও ভালোবাসা হলো সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করেছেন, তা ভবিষ্যতে আরও সুন্দর একটি সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। রমজান আসে প্রতি বছর, কিন্তু এমন সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে আজীবন। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের এই ইফতার আয়োজনও ঠিক তেমনই একটি অসাধারণ সম্প্রীতির স্মারক, যা প্রতিবার নতুন করে মনে করিয়ে দেবে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর মানবিকতার কথা।

লেখক

সাধারণ সম্পাদক, 

রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি, 

রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *