Thursday, April 3

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রমজানের হৃদ্যতা

ক্লাস, মিড এক্সাম, এসাইনমেন্টের চিরচেনা ব্যস্ততায় ভিন্ন আমেজ তৈরী করে রমজান। মুসলমানদের জীবনে রমজান সংযম, ত্যাগ আর আত্মশুদ্ধি নিয়ে আসে বলেই গোটা মুসলিম পৃথিবী সেজে ওঠে সম্প্রীতির আমেজে। এই হৃদ্যতা ও সম্প্রীতি ছড়িয়ে পড়ে সবখানে, এমনকি চিরচেনা ব্যস্ত ক্যাম্পাসেও। তৈরী হয় হৃদ্যতার উৎসব। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত শিডিউলের মাঝেই রমজান পেয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পঁচিশটি ডিপার্টমেন্টের কোনটিতে নিয়মিত সকাল নয়টা থেকে ক্লাস কোনটিতে মিড কিংবা সেমিস্টার পরীক্ষা। ব্যস্ত শিডিউলের দৈনন্দিন জীবনে ৫৮ একরের এই আয়োজনে সেহরি আর ইফতারের সময়টা পরিণত হয় হৃদ্যতার উৎসবে। রাতের শেষাংশে হলের ডাইনিং, ক্যাফেটেরিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন খাবার হোটেলগুলো শিক্ষার্থীদের কোলাহলে সরব হয়ে উঠে। জানান দেয় অমায়িক সম্প্রীতির বার্তা। সূর্যাস্তের পূর্বক্ষনে ইফতারের আগমূহুর্তের আমেজ যেন আরও বাহারী হয়ে উঠে। আসরের পর থেকেই ইফতারের আয়োজনে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। মূলত ইফতারের এই মূহুর্তটিই ক্যাম্পাসের আবহে নতুন মাত্রা যোগ করে। 

সেহরি ব্যক্তিগতভাবে করা হলেও ইফতার আয়োজন সাধারণত একাকি হয়ে উঠে না। ক্যাম্পাসে বন্ধুত্বের সৌন্দর্য ফুটে উঠে এই ইফতার কেন্দ্রিক আয়োজনের মাধ্যমেই। পরিবারের সাথে কাটানো নির্দিষ্ট ঘর, গুছানো ডাইনিং টেবিল এখানে অনুপস্থিত। তবে কোনকিছু নির্ধারিত না থাকলেও সবকিছু গুছানো হয়ে যায় ঠিক সময় মতো। কখনো হলের রুম, হলের ছাদ, খেলার মাঠ কিংবা ফ্যাকাল্টির করিডরে। ছোট ছোট পাঁচ থেকে সাতজনের গ্রুপগুলোই যেন একেকটি পরিবার।

সারাদিন ব্যস্ততার পর অন্য সময় হয়তো এভাবে আয়োজন করে বসা না হয়ে উঠলেও রমজানে নিয়মিত বসা হয়, সাথে আড্ডা আর খুনশুটি তো আছেই। এই সুযোগে সবাই নিজেদের গল্পের ঝাপি খুলে বসে। রঙিন হয়ে মেলে ধরে ভ্রাতৃত্বের আর বন্ধুত্বের রঙ। 

কারো কাছে এই রমজান প্রথম আবার কারো কাছে এটাই ক্যাম্পাসের শেষ রমজান। সে হিসেবে অনুভূতিগুলোও ভিন্ন হয়। কথা হচ্ছিল স্নাতকোত্তরের মাহমুদুল হাসান হৃদয়ের সাথে। অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়েই বলেন, ক্যাম্পাস লাইফে রমজান মাসটা বেশ উপভোগ্য একটা বিষয়। হোক সেটা সারারাত জেগে সেহরি করে ঘুমানো কিংবা সবাই মিলে একসাথে ইফতার করা। তাছাড়া রমজান মাসে ক্লাস, পরীক্ষা থাকলেও শেষ দিকে যখন বন্ধের সময় চলে আসে তখন সবার বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। তখন ক্যাম্পাসে পরিচিত একটা শব্দ হলো, কিরে! কবে যাচ্ছিস? এই শব্দটা ছোট হলেও এটা দ্বারা অনেক বৃহৎ অর্থ বুঝায়। এই, কিরে! কবে যাচ্ছিস এর অর্থ ক্যাম্পাসের ভেতরকার মানুষরাই উপলব্ধি করতে পারে। মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যাওয়ায় এটাই আমার ক্যাম্পাস জীবনের শেষ রমজান। সেই হিসেবে এই রমজানটা বেশ স্মৃতিময় হয়ে থাকবে। আমি মনে করি, ক্যাম্পাসের রমজানের মুহুর্তটা সারা জীবনের স্মৃতি হিসেবে থাকে।

অপরদিকে যাদের এটাই প্রথম রমজান ক্যাম্পাসে তাদের চোখে মুখে যেন দারুণ উদ্দীপনা প্রকাশ পায়। প্রথম বর্ষের ইয়াসিন আরাফাত উচ্ছ্বসিত হয়ে তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, এ বছর প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসে রমজান কাটাচ্ছি, যা সত্যিই এক নতুন অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর এটাই আমার প্রথম রমজান, পরিবার ছাড়া সেহরি-ইফতার করা এবং বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার ভাগাভাগির আনন্দ এক অন্যরকম অনুভূতি দিচ্ছে। ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝেও রমজান মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। ইফতারের সময় ক্যাম্পাসের উৎসবমুখর পরিবেশ, সবার সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া সবকিছুই মনে রাখার মতো এক অভিজ্ঞতা।

পশ্চিম আকাশে লাল আভার ছড়িয়ে পড়া এবং শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত ছুটাছুটিই জানান দেয় ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসার। চোখে পড়ে নিজেদের পছন্দসই সাধ্যের মধ্যে ভালো খাবারটাই কিনে নেওয়ার চঞ্চলতা। বাঙালির অতিসাধারণ প্রিয় ভাজাপোড়া পিঁয়াজু, ছোলা, বেগুনি, বুন্দিয়া, জিলাপি, চপ আর কত কি!

অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় পোর্টেবল ছোট টেবিলে খাবারের পসরা সাজিয়ে নিয়ে বসার। এতে যেমন পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করা যায় তেমনি নিজের দৈনন্দিন হাত খরচেরও একটা ব্যবস্থা হয়। তাদের মধ্যে একজন মার্কেটিং বিভাগের ইয়াসিন ইসলাম। নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ক্যাম্পাসে ব্যাবসা করার চিন্তা আগে থেকেই ছিল,তবে ছোটখাটোভাবে এক্সিকিউশন টা হলো এই রমজানে। শুধু প্রফিটের কথা চিন্তা করে নয়, বরং পড়াশোনার জন্য  পরিবার থেকে দূরে থাকা ভাই,বন্ধু, ছোট ভাই-বোনদের কথা মাথায় রেখে ছয় প্রকারের ফলের একজনের প্যাকেজ এবং বেলের শরবত একদম কম দামে বিক্রি করেছি। রমাদানে সারাদিন রোজা রেখে সবাই যেন অল্প টাকায় কিছু ফল খেতে পারে এই চিন্তা করেই একটা ছোট স্টল দিয়েছি। পাশাপাশি বেলের শরবতও সুলভ মূল্যে দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো প্রসংসাও পেয়েছি। ঈদের পর ইন শা আল্লাহ ভালো কিছু নিয়ে স্টল দিব।

রমজান ক্যাম্পাসে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আগমন করে। যেমন বন্ধুত্ব আরও গাড় করে তেমনি ভেদাভেদ দূর করে। সিনিয়র জুনিয়র সম্পর্কে আরও হৃদ্যতা আনে। ত্যাগ আর সহমর্মিতার অনন্য দৃষ্টান্ত মেলে ধরে।

মুতাসিম বিল্লাহ, 

শিক্ষার্থী,  

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *