১৪ মে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং চীন সফররত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে নিবিড় আলোচনায় অংশ নেন। এতে ছিল আনুষ্ঠানিক বৈঠক, ছিল হেভেন টেম্পল পরিদর্শন এবং স্বাগত নৈশভোজ। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সহাবস্থানের উপায় ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক কৌশল কী হতে পারে তা নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়েছে দুই রাষ্ট্রনেতার। চীন-মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তো বটেই, সেইসঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গেও এ আলোচনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১৪ মে সকালে প্রেসিডেন্ট সি বেইজিংয়ের মহাগণভবনের পূর্ব মহাচত্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। দুই নেতা প্রায় দশ সেকেন্ড হাসিমুখে করমর্দন করেন। আর তাতেই বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমগুলোয় রচিত হতে শুরু করে একের পর এক শিরোনাম।
দুই দেশের জন্যই ২০২৬ সালটি গুরুত্বপূর্ণ। এ বছর চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করবে।
বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি বলেন, ‘২০২৬ সাল চীন-মার্কিন সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনার ঐতিহাসিক ও মাইলফলক বছর হয়ে উঠতে পারে।’ এই প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে চলতি বছর দুই দেশের নেতাদের প্রথম মুখোমুখি বৈঠকের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
বৈঠকের শুরুতেই প্রেসিডেন্ট সি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি জানতে চান—চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি ‘থুসিডাইডিসের ফাঁদ’ কাটিয়ে উঠে বড় দেশগুলোর সম্পর্কের একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে? দুই দেশ কি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করে বিশ্বে আরও স্থিতিশীলতা আনতে পারবে? উভয় দেশের জনগণের কল্যাণ ও মানবতার ভবিষ্যতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কি তারা যৌথভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে?
তার মতে, এগুলো ইতিহাসের প্রশ্ন, বিশ্বের প্রশ্ন এবং জনগণের প্রশ্ন—যার উত্তর প্রধান শক্তিগুলোর নেতাদের এই সময়েই যৌথভাবে দিতে হবে।
২০১৭ সালে চীন সফরকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম কর্মসূচি ছিল বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘ফরবিডেন সিটি’ বা ‘নিষিদ্ধ নগর’ পরিদর্শন। বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট সি ও ট্রাম্প থিয়ান থান, অর্থাৎ হেভেন টেম্পল পরিদর্শন করেন।
প্রেসিডেন্ট সি বলেন, প্রাচীনকালে চীনের শাসকরা হেভেন টেম্পলে উৎসর্গের মহৎ অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন এবং দেশের শান্তি, জনগণের নিরাপত্তা ও অনুকূল আবহাওয়ার জন্য প্রার্থনা করতেন। ‘জনগণই রাষ্ট্রের ভিত্তি, ভিত্তি দৃঢ় হলে রাষ্ট্র শান্ত থাকে’—এই চীনা প্রাচীন দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় এখানেই।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের মনোমুগ্ধকর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই মহান দেশ, দুই দেশের জনগণই মহান ও মেধাবী। তাই দুই দেশের উচিত পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর করা এবং জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়ানো।
দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠক দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। বৈঠকে দুই নেতা গঠনমূলক, কৌশলগত ও স্থিতিশীল চীন-মার্কিন সম্পর্ক গড়ে তোলাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অবস্থান হিসেবে সমর্থন করেন। বলা হচ্ছে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আগামী তিন বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য চীন-মার্কিন সম্পর্কের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেবে।
প্রেসিডেন্ট সি বলেন, চীন-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবার আগে সমাধান করা প্রয়োজন, তা হলো কৌশলগত উপলব্ধি।
প্রশ্ন আসে, কীভাবে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বাস্তবায়ন করা সম্ভব? সি’র মতে, এর জন্য দরকার সহযোগিতাকেন্দ্রিক ইতিবাচক স্থিতিশীলতা, সংযত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সুস্থ স্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রিত মতপার্থক্যের মধ্যে স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তির সম্ভাবনাময় দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা। তিনি আরও বলেন, চীন-মার্কিন সম্পর্ক যদি এই ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে পারে, তবে তা অস্থির বিশ্বে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারবে।
প্রেসিডেন্ট সি জোর দিয়ে বলেন, চীন-মার্কিন গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক কোনো স্লোগান নয়; এটি বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট সি’র সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করতে এবং মতপার্থক্য গঠনমূলকভাবে মোকাবিলা করতে আগ্রহী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশ একসঙ্গে আরও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে।
সামনের নানা অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বেইজিংয়ে চীনা ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বৈঠকে যে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়েছে, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
(তুহিনা/ফয়সল)



















