Thursday, April 3

পাখিরা যেদিন উড়তে শিখল

ধ্রুব নীল : ‘সবচেয়ে বড় ডিম কে পাড়ে!’

সবাই চুপ। টুঁ শব্দ করছে না শালিক, ময়না আর টিয়া। টুনটুনিটাও লুকিয়েছে বুলবুলির পেছনে। উটপাখির গর্জন শুনে কাঁপছে বুড়ো ইগলও।

‘বলো কে!’

ধ্রুব নীলের গল্প

আবার হুংকার ছাড়ল রানি উটপাখি। পাখিদের রাজ্যে সে-ই সবচেয়ে জোরে ছোটে। গায়ে অনেক শক্তি। তাই পাখিরাজ্যের রানি সে।

‘রানি মা, আপনিই সবচেয়ে বড় ডিম পাড়েন। আপনার ডিমের তুলনা হয় না। প্রতিটি ডিম পাক্কা দেড় কেজি।’

বলতে বলতে দম ফুরিয়ে যাওয়ার দশা শকুনের।

উটপাখির ভক্ত সে। রানির কথা অক্ষরে অক্ষরে মানে।
‘হুম! এ কারণে আমিই রানি। আর পুঁচকে চড়ুইটা কি না চুরি করে আমার দানা খেয়েছে! একেবারে পা কেটে দেব আজ।’

গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল পাখিদের মধ্যে।

কাকাতুয়া আর পেঁচারা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতে লাগল, ‘আহারে, পা কেটে দিলে বেচারা হাঁটবে কী করে। আহারে!’
এদিকে ভয় পেল না চড়ুই। একরোখা স্বভাব তার। একছুটে উঠে গেল একটা ঢিবির ওপর। চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘ভাইসব, সব দানা কারা কুড়িয়ে আনে?’

পাখিরা চুপ। সবাই জানে ছোট ছোট পাখিই দানা কুড়ায়।

চড়ুই বলল, ‘আমরা কুড়িয়ে আনি। আমাদের কুড়ানো দানা খেয়েই বেঁচে আছে উটপাখি। অথচ আমাদের জন্য একটুও রাখে না। উল্টো চুরির অভিযোগ তোলে।’

চড়ুইয়ের সাহস দেখে রাগে গরগর করছে রানি উটপাখি। ইশারা করতেই ছুটে এলো তার ছেলেপিলে ও নাতি-পুতিরা। মানে ওরাও উটপাখি।

‘চড়ুইকে আজ চিড়েচ্যাপ্টা করে ছাড়বে।’ ফিসফিস করে বলল একটা ধনেশ।

চড়ুই তিড়িংবিড়িং করে দৌড়ায়। একবার ঘাসের আড়ালে তো আরেকবার বুনো ফলের ঝোপে। তাকে ধরতে পারে না কেউ।

একসময় সভা ভাঙল। পাখিদের মধ্যে তুমুল হৈচৈ লেগে গেছে। চড়ুইয়ের সাহসের প্রশংসা করছে সবাই ফিসফিস করে।

কাঠঠোকরা বলল, ‘ঠিক ঠিক ঠিক! কষ্ট করে খাবার খুঁজি। কেড়ে নেয় রানি। এটা মানা যায় না, ঠিক কি না! ঠিক কি না!’

কোকিল বলে, ‘কুঁড়ে রানি। একটা কণাও কুড়োয় না। সব কুক্ষিগত করে। কী কূটচাল!’

ছোট্ট টুনটুনি বলে, ‘কিছু দেব না, কিশমিশ দেব না, চিনি দেব না, মিছরি দেব না।’

এভাবে কেটে গেল দিন। রাতে পাখিরা সবাই একজোট হলো। একটা বড় মাঠ। মাঠে উঁচু ঢিবি। একটু পর ঢিবির ওপর চড়ুইকে দেখা গেল।

সবাই চুপ। চড়ুই পায়চারি করছে আর ভাবছে। এমন সময় ভিড়ের মধ্যে বাবুই বলল, ‘চড়ুই তুই ধরা দিয়ে দে বাপু। সারেন্ডার কর। তা না হলে রানি আমাদের সবার পা কেটে দেবে।’

শুনে মেজাজ চড়ে গেল চড়ুইয়ের। ‘কে বলল! কে বলল কথাটা!’

আমতা আমতা করে এগিয়ে এলো বাবুই পাখি।

‘আরো কাছে আয়!’

বাবুই হলো চড়ুইয়ের বন্ধু। তবে চড়ুইয়ের মেজাজকে সে-ও ভয় পায়। সে জানে এখন মাথায় একটা চাঁটি বসাবে চড়ুই। কাছে গেল বাবুই। দ্রুত পা চালিয়ে তেড়ে এলো চড়ুই। ডানা উঁচু করে সবেগে দিল চাঁটি।

‘ও মাগো। আস্তে!’

কিন্তু এ কী! বাবুই পাখির মাথায় ডানা দিয়ে বাড়ি দিতেই চড়ুই একটা কিছু টের পেল। সঙ্গে সঙ্গে আবার বসালো।

‘আহা! ভুল হয়েছে বন্ধু। আর মারিস না।’

‘আরে না না। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। তোর মাথায় চাঁটি মারার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো আমার ওজন কমে গেছে।’

আবার গুঞ্জন শুরু উপস্থিত পাখিদের মধ্যে। চড়ুই এবার শূন্যের মধ্যে ডানা দিয়ে অদৃশ্য কাউকে মারতে লাগল আর অদ্ভুতভাবে লাফাতে লাগল। পাখিদের অনেকে ভাবল, চড়ুইয়ের বুঝি মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

‘ভাইসব। আমার দেখাদেখি তোমরাও এ কাজ করো। ব্যালান্স ঠিক রাখতে হবে। একসঙ্গে দুটি ডানা দিয়ে সমান গতিতে শূন্যে আঘাত করতে থাকো। হুম… এই তো হচ্ছে! হচ্ছে!

বেশ! বেশ!’

সে রাতে পাখিদের গোপন সমাবেশে ঘটল অদ্ভুত ঘটনাটা। যে ঘটনা পাখিদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। রাতভর চলল ট্রেনিং। পাখিরা এখন সবাই তৈরি।

সকালে উটপাখি তলব করেছে সবাইকে। চড়ুইকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।

সকাল সকাল হাজির পাখিরা। তবে আগের মতো কারো চোখে ভয় নেই। উটপাখি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা চিন্তায় পড়ে গেল। পাখিরা কেউ দানাও নিয়ে আসেনি।

‘আমার দানা কোথায়!’

‘আমরা আর তোমাকে দানা দেব না!’

ভিড়ের মাঝ থেকে বলল একটা বুলবুলি।

‘না না না। কেউ দানা দেব না। আমাদের দানা আমাদের থাকবে।’ পুঁচকে টুনটুনিও তেড়ে এসে বলল।

‘তবে রে!’ হুংকার ছাড়ল উটপাখি। সঙ্গীদের ইশারা করে বলল, ‘যাকে পাবি তাকে ধরে আছাড় দিবি! যাও!’

এমন সময় ঘটল অদ্ভুত ঘটনাটা। উটপাখি তো দূরে থাক, বনের বাকি প্রাণীরাও এমনটা কল্পনা করেনি। পাখিরা সবাই সপাং সপাং করে তাদের ডানা নিচের দিকে ঝাপটাতে লাগল। একমুহূর্তে ওপরে উঠে গেল সবাই। মাটি ছেড়ে অনেক উঁচুতে। তাদের দেখাদেখি উটপাখিও চেষ্টা করল। কিন্তু ঢাউস শরীরটাকে কিছুতেই শূন্যে ভাসাতে পারল না।

ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উটপাখির নাকের ডগায় তিড়িংবিড়িং করছে চড়ুইটা। ‘এবার তোমার মুকুট ছিনিয়ে নেওয়ার পালা বুঝলে! আমরা উড়তে শিখেছি। আমরা এখন স্বাধীন। আর তুমি বসে বসে ডিম পাড়ো।’

উড়ন্ত পাখির দল দেখে ভড়কে গেল উটপাখি। একটু পর পর শোঁ করে উড়ে এসে ঠোকর বসাচ্ছে কাঠঠোকরা আর ধনেশ। কী শক্ত ঠোঁট ওদের! মাথা বাঁচাতে উটপাখির দল একটা হাস্যকর ঘটনা ঘটাল। বালু মাটিতে গিয়ে সোজা মাথাটা গেঁথে দিল। ভাবখানা এমন যেন তাকে কেউ দেখতেই পাচ্ছে না।

ওদিকে চুপিসারে চলে গেল শকুনের দলও। ওরাও উড়তে জানে। কিন্তু চড়ুই, টুনটুনি আর বাবুই পাখির সাহস দেখে লড়তে গেল না।

সেদিনের সেই ঘটনা থেকেই পাখিরা উড়তে শিখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *