জলবায়ু ও কৃষকবান্ধব ‘বাউ বায়োচার চুলা’ উদ্ভাবন করলেন বাকৃবির একদল গবেষক  - Mati News
Friday, January 9

জলবায়ু ও কৃষকবান্ধব ‘বাউ বায়োচার চুলা’ উদ্ভাবন করলেন বাকৃবির একদল গবেষক 

বাকৃবি থেকে মুরসালিন আনোয়ার – 

ময়মনসিংহের ভাবখালীর কৃষক আব্দুল হামিদকে দেখা যাচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের চুলায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করছেন। আবার রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার গৃহিণী পারভীন বেগম তাঁর পরিবারের সাত-আট জন সদস্যের জন্য ওই বিশেষ চুলাটিতে রান্নাবান্না করছেন। চুলাটিতে রান্নার সময় এবং জ্বালানি দুই-ই কম লাগে। আবার বিশ্বজুড়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বিজ্ঞানীদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির কারণে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃষি বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নানাসময় উপযোগী গবেষণার মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছে। সেই ঐতিহ্যকে বজায় রেখে এমন একটি চুলা উদ্ভাবন করেছে যা একই সাথে কৃষকের রান্নার খরচ ও সময় কমাবে এবং পরিবেশে কার্বন মূলকের নিঃসরণ কমাবে। গবেষক দল ওই চুলাটির নাম দিয়েছেন ‘বাউ বায়োচার চুলা’।

​গবেষক দল দাবি করেছে তাঁদের উদ্ভাবিত চুলাটিতে উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করার সময় বিনামূল্যে বায়োচার পাওয়া যাবে, যা জমি ও গবাদিপশু থেকে কার্বনমূলক তথা মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমাবে। বাকৃবির গবেষক দলের উদ্ভাবিত জলবায়ু ও কৃষকবান্ধব ওই চুলাটি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ইন্টার ডিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি-এর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুরসালিন আনোয়ার।

বায়োচার মাটির উর্বরতা বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে। এটি সাধারণ কয়লার মতো নয় বরং এটি অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে উচ্চ তাপমাত্রায় তৈরি করা হয় যা মাটির গুণাগুণ শত শত বছর ধরে বজায় রাখতে সক্ষম। বায়োচারের গঠন অনেকটা স্পঞ্জের মতো ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় এটি মাটিতে পানি এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে জমিতে বারবার সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না এবং বৃষ্টির পানিতে সার ধুয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং অণুজীবদের জন্য এটি একটি আদর্শ বাসস্থান হিসেবে কাজ করে যা গাছের বৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রাখে। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এটি কৃষকের চাষাবাদের খরচ অনেক কমিয়ে আনে। পরিবেশের জন্য এটি অত্যন্ত আশীর্বাদস্বরূপ কারণ এটি বাতাসের ক্ষতিকর কার্বনকে মাটির গভীরে আটকে ফেলে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সহায়তা করে। কৃষিজাত ফেলে দেওয়া বর্জ্য পুড়িয়ে এটি তৈরি করা হয় বলে এটি একটি উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। 

A bangladeshi innovation Biocooker

রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণীর ‘চাষী’ কবিতাটি পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক নীরব সংগ্রামের ছবি। মাটির মানুষটি, যে নিজের সুখ-দুঃখের হিসাব না কষে আমাদের অন্ন জোগাতে সারাটি জীবন ব্যয় করে—

“মুক্তিকামী মহাসাধক মুক্ত করে দেশ, সবারই সে অন্ন জোগায় নাইক গর্ব লেশ। ব্রত তাহার পরের হিত, সুখ নাহি চায় নিজে, রৌদ্র দাহে শুকায় তনু, মেঘের জলে ভিজে।”

এই পঙ্‌ক্তিগুলো কি শুধই কবিতার লাইন? পঙ্‌ক্তিগুলো এদেশের কৃষকের প্রতিদিনের জীবনকথা। ভোরের আলো ফোটার আগেই যিনি মাঠে নামেন, সন্ধ্যার অন্ধকার নামার পরও যাঁর শরীর জুড়ে লেগে থাকে মাটির গন্ধ। আমরা শহরে বসে ভাতের থালা সাজাই আর সেই ভাতের প্রতিটি দানার পেছনে লুকিয়ে থাকে কৃষকের ঘাম, ক্লান্তি আর নিঃশব্দ ত্যাগ।

তবু পরিহাস এই যে, যিনি সবাইকে খাওয়ার জন্য পরিশ্রম করেন তাঁর নিজের জীবনটাই থেকে যায় টানাপোড়েনের মধ্যে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করেও অধিকাংশ কৃষক দিন শেষে কাটান নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে। এই কষ্ট এক দিনে মুছে ফেলা সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁদের পথটুকু যদি একটু সহজ করা যায় তাহলেই যেন শ্রমের ভার কিছুটা হালকা হয়।

সেই আশার জায়গাতেই বিজ্ঞান এসে হাত বাড়ায়। দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণা আর উদ্ভাবন কৃষকের জীবনে নীরবে আলো জ্বালায়। এসব আবিষ্কারের সুফল শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না ছড়িয়ে পড়ে আমাদের ঘরে, আমাদের খাবারে, আমাদের পরিবেশে।

এই ভাবনা থেকেই বাকৃবির গবেষক দল এগিয়ে এসেছেন ভিন্ন এক উদ্যোগ নিয়ে। পরিবেশ রক্ষায় বায়োচারের সম্ভাবনা আর কৃষকের দৈনন্দিন প্রয়োজনে চুলার ব্যবহার এই দুই বাস্তবতাকে এক সুতোয় বেঁধে জন্ম নিয়েছে ‘বাউ বায়োচার চুলা’।

‎বাকৃবির প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মো. সহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে চুলাটি উদ্ভাবিত হয়েছে। ওই গবেষক দলে আরও যুক্ত রয়েছেন ‎মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মো. মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর, বাকৃবি প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থী মো. আশিকুজ্জামান, মুহাম্মদ সোহান, পিএইচডি শিক্ষার্থী সুমন চন্দ্র মহন্ত ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মো. আল নূর তারেক। 

‎গবেষক দল জানিয়েছেন, ওই চুলা ব্যবহার করে এক সাথে যেমন উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করা যাবে তেমনিভাবে গবেষণায় ব্যবহৃত বায়োচারও উৎপাদন করা যাবে। যারা নিয়মিত কাঠ, কয়লা বা অন্যান্য জালানী দিয়ে রান্না করে তাদের জন্য চুলাটি বেশ উপযোগী। সাধারণত বায়োচার তৈরি করা অনেকটা ব্যয়বহুল। তবে আমাদের চুলা দিয়ে সহজেই অল্প খরচে বায়োচার তৈরি করা সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটি) অর্থায়নে‎ পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পটি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে।

‎বায়োচার সম্পর্কে দলটির প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, বায়োচার মুলত বিশেষ ধরনের কয়লা বা চারকোল যা উচ্চ তাপমাত্রায় অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে তৈরি হয়। বিশেষ ধরনের এই চুলাটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে। এই চুলায় তৈরি বায়োচার এর গুনগতমান পরীক্ষা করে দেখা গেছে এতে অজৈব কার্বনের পরিমান বেশি এবং ন্যানো বায়োচার তৈরি করার মত উপযোগী। 

‎তিনি আরো বলেন, এই বায়োচার জমি ও গবাদিপশু থেকে মিথেন গ্যাসের নি:সরন কমাবে এবং জলবায়ু বান্ধব ফসল ও গবাদিপশুর উৎপাদন নিশ্চিত করবে।

অধ্যাপক ড. মো. মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর বলেন, চুলাটিতে তৈরি বায়োচার এর অজৈব ও জৈব কার্বন ও অন্যান্য উপাদান পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির কেয়ালিটি টপ ক্লাস। কৃষক এই চুলা বাড়িতে নিয়মিত রান্নার কাজের সাথে বায়োচার তৈরি করে জমিতে সারের সাথে ব্যবহার করতে পারবেন। 

তিনি আরো বলেন, মাটির গুনাগুন বৃদ্ধিতে বায়োচারের ব্যবহার সারা বিশ্বজুড়ে নন্দিত একটি পদ্ধতি। বাংলাদেশেও অতি সম্প্রতি বায়োচারের ব্যবহারের শুরু হয়েছে। তবে বায়োচারের উৎপাদন খরচ বেশি। আমাদের উদ্ভাবিত চুলায় রান্নার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বায়োচার তৈরি হবে। 

গবেষক দলের সদস্য মো. আশিকুজ্জামান বলেন, বাউ বায়োচার চুলাটির বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করে স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্পমূল্যেই উদ্ভাবন করা হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে চুলাটির মাধ্যমে রান্না তুলনামূলক কম সময়ে ও কম জ্বালানি ব্যবহার করে করা যায়। ব্যবহারের পর কৃষকদের মতামত থেকে এমনটিই জানতে পেরেছি। আবার চুলাটির মাধ্যমে প্রায় বিনামূল্যেই উচ্চতর গবেষণার জন্য বায়োচারও পাওয়া যায়।

বায়োচার চুলাটির পরীক্ষামূলক ব্যবহারকারী ময়মনসিংহের ভাবখালির আব্দুল হামিদ বলেন, “স্যারের এই উদ্ভাবিত চুলাটি বিশেষ করে চর অঞ্চল, শহর, গ্রাম অঞ্চলে রান্নার জন্য খুবই উপযোগী কারণ এটি যেমন জ্বালানি সাশ্রয়ী তেমনি কম সময়ে রান্না করা যায়। আমার মনে হয় এই চুলাটি সারা বাংলাদেশ জনপ্রিয়তা লাভ করবে।”

আরেক ব্যবহারকারী রংপুরের মিঠাপুকুরের পারভীন বেগম বলেন, “আমার পরিবারের সাত-আট জনের রান্না এই চুলায় রান্না করি। এই চুলা ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক কম সময় লাগে। তাছাড়া জ্বালানি হিসেবে লাকড়িও লাগছে পরিমাণে কম।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *