নস্টালজিয়ার স্পর্শে নতুন প্রজন্মের মন জয় - Mati News
Monday, April 13

নস্টালজিয়ার স্পর্শে নতুন প্রজন্মের মন জয়

ফয়সল আবদুল্লাহ

আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে মানুষ প্রায়ই ফিরে যেতে চায় অতীতের স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির টানই অনেক সময় হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক শান্তি—একটি নরম আশ্রয়। আর ঠিক এই নস্টালজিয়াকেই কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে চীনের পুরনো ব্র্যান্ড।

২৪ বছর বয়সী লি সিনইউ এক অলস দিনে মোবাইল ফোনে স্ক্রল করছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডনোট-এ। একটি পুরনো ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম তার চোখে পড়ে। ছোট গোলাকার কৌটায় ভরা ক্রিমটি সাজানো ছিল লাল, কালো ও সোনালি ফুলের নকশায়—মুহূর্তে অতীতের নান্দনিক দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় লি’র।

কৌতূহল থেকে তিনি রিভিউ পড়তে শুরু করেন। আর সেই দিনই বাড়িতে গিয়ে তার দাদির ড্রয়ারে খুঁজে পান একই ধরনের ক্রিম। তবে সেটা বহু আগের।

লি বলেন, ‘বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল দাদির সময়ের একটা জিনিস হঠাৎ আমারও হয়ে গেল।’

লির দাদি বললেন, এই ক্রিম সস্তা হলেও কাজ করে ভালো। এর গন্ধে আছে বহু স্মৃতি। লির ভাষায়, ‘মনে হয় যেন এক কৌটা টাইম মেশিন!’

এই অনুভূতিই চীনের তরুণদের কাছে নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলেছে ওয়ান চি ছিয়ান হোং নামের ব্র্যান্ডটিকে। যার নামের বাংলা অর্থ রঙের উচ্ছ্বাস।

১৯১১ সালে ব্র্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন লিউ খাইপিং। তার মৃত্যুর পর ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখতে তার ছোট ভাই প্রতিষ্ঠানটি লিয়াওনিং প্রদেশের শেনইয়াং থেকে থিয়েনচিনে স্থানান্তর করেন।

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ব্র্যান্ডটির জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে প্রতি বছর প্রায় ২০ কোটি কৌটা বিক্রি হতো। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে ধীরে ধীরে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে।

দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতার পর আবার আলোচনায় আসে ব্র্যান্ডটি। এর পেছনে কাজ করেছে চীনের জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রবণতা কুয়োছাও বা ‘চায়না-চিক’। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মিম সংস্কৃতি তো আছেই।

২০২৩ সালে ব্র্যান্ডটির এক লাইভস্ট্রিম বিক্রি মাত্র তিন ঘণ্টায় ২ লাখ ৫০ হাজার ইউনিট ছাড়িয়ে যায়। এত চাহিদা ছিল যে অনেক ক্রেতাই দেরিতে পণ্য পৌঁছালেও ক্ষতিপূরণ নেননি। তারা বুঝতে পারছিলেন কোম্পানিটা বেশ নস্টালজিয়ার চাপে আছে।

চীনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্য বিক্রি শুধু ব্যবসা নয়, এটি সংস্কৃতিও তৈরি করে। ভিডিও প্ল্যাটফর্ম তৌয়িন ও রেডনোট-এ তরুণ ব্যবহারকারীরা এই ক্রিম নিয়ে নানা মজার মিমও বানাতে শুরু করেন।

কেউ লিখেছেন—‘জীবনের অর্ধেক পার করার পর বুঝলাম, টিনটি খুলতে টানতে হয় না, ঘুরাতে হয়!’

আবার কেউ মজা করে ব্র্যান্ডটিকে ডাকছেন ‘তাই নাই’—যার মানে ‘প্রপিতামহী’।

এই ব্র্যান্ডের কারখানাও অনলাইনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভিডিওতে দেখা যায় কর্মীরা হাতে করে ক্রিম ভরে দিচ্ছেন কৌটায়। সেই ভিডিওগুলোও দেখছে লাখ লাখ মানুষ।

অনেকে মন্তব্য করেছেন, এই প্রক্রিয়াটি দেখলেও এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।

একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘কর্মীদের হাত দেখেই বোঝা যায় এই ক্রিম কাজ করে। কারণ তাদের হাত বেশ মসৃণ।’

অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তাদের দাদা-দাদিকে ট্যাগ করছেন। যেন এক প্রজন্মের স্মৃতি আরেক প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

ব্র্যান্ডটির পরিচালকরা জানালেন, এর প্রধান ক্রেতা ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। তারা হালকা টেক্সচার, সহজ ব্যবহার এবং নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া—এই তিনটি বিষয় চায়।

এই সাফল্য যেন একটি বড় সত্য মনে করিয়ে দেয়—কখনও কখনও ভবিষ্যতের পথ লুকিয়ে থাকে অতীতের ভেতরেই। আর সেই অতীতের স্মৃতিই আজকের ভোক্তাদের কাছে হয়ে উঠেছে এক কোমল, নিরাময়ী স্পর্শ—একটি নস্টালজিয়ার ক্রিম।

সূত্র: সিএমজি

https://img2.chinadaily.com.cn/images/202604/10/69d8455da310d68600fb55ac.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *