‘চীন একটি স্থিতিশীল শক্তি, বিশ্বে তার অবদান বিশাল’ - Mati News
Thursday, April 9

‘চীন একটি স্থিতিশীল শক্তি, বিশ্বে তার অবদান বিশাল’

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইআইএসএস জার্নাল-এর সম্পাদক এবং চীন দক্ষিণ এশিয়ার সম্পর্ক, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে খ্যাতিমান একজন গবেষক মোহাম্মদ আশিক রহমান সিএমজি বাংলা সার্ভিসে একটি সাক্ষাত্কার দেন। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫১ বছর ও ভবিষ্যত, চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ এবং চীনের উত্থাপিত বৈশ্বিক উদ্যোগ ও বিশ্বের স্থিতিশীলতা নিয়ে তার মতামত প্রকাশ করেন তিনি। তার সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সিএমজি বাংলার সাংবাদিক ইয়াং ওয়েই মিং স্বর্ণা।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫১ বছর ও ভবিষ্যত সম্পর্কে বলুন

গত ৫ দশকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কটাকে তিনটা পর্ব ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব হল ৭৫ থেকে শুরু করে আশির দশকের শেষের দিকে পর্যন্ত। এ সময়পর্বে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিটা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ থেকে শুরু করে প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার ও প্রতিরক্ষাকর ক্ষেত্রে সম্পর্কগুলি তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্ব ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে সম্পর্কটা আরো বিস্তার লাভ করেছে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক। ২০০৬ সালে চায়না বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০০৬ সালের পরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পিপল টু পিপল সম্পর্কসহ বিভিন্ন দিকে বিস্তারিত হয়েছে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ সবদিকে বিস্তার লাভ করে। আর ২০১৬ সালে চীন ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) উত্থাপন করে। ওই উদ্যোগের অধিনে বাংলাদেশ সবচেয়ে আগে যোগ দেওয়া দেশগুলোর অন্যতম। তারপর থেকে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বাংলাদেশ সফর করেন। তারপর থেকে বলা যায় যে আমাদের সম্পর্কে একটা নতুন মাত্রায় চলে যায়। এবং তারপর থেকে একটা নতুন দিক তৈরি হয়। সেটা হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা। ২০১৬ সালের পরে চীন আমাদের কিছু মেগা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডিভেলপমেন্টে খেতে সহযোগিতা করছে। যেমন কর্ণফুলি টানেল, ঢাকা এক্সপ্রেস ওয়ে। পদ্মা সেতু আমাদের সবচেয়ে প্রধান অবকাঠামোর অন্যতম। সেখানে অনেকগুলো কাজ চায়না আমাদেরকে সাহায্য করেছে। পদ্মা সেতুর রেলওয়ে অংশটা চীন তৈরি করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে।

এখন যদি দিকনির্দেশনার কথা বলি এবং আমরা কি শিখলাম তাহলে আমি বলব যে চায়নাকে বলা হয় বাংলাদেশের জনগণের ট্রাস্টেড ফ্রেন্ড বা বিশ্বস্ত বন্ধু এবং আমাদের সম্পর্কটা অনেকটা সমতার উপর ভিত্তি করে। এই বিষয়গুলা হচ্ছে চীন-বাংলাদেশ মৈত্রীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, যে এটা হচ্ছে পারস্পরিক উপকারিতামুলক সম্পর্ক। পৃথিবীর অনেক দেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটু ডমিনেটিং মনোভাব থাকে। চীন যদিও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় দেশ এবং বিশ্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, কিন্তু বাংলাদেশের সাথে চায়নার সম্পর্কতে অসমতা বিষয়টা কখনোই কাজ করে না। আমাদের সম্পর্কটা সবসময় সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। এই জায়গাটাকেই আমাদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এবং আমার মনে হয় যে আমি যে গবেষণা করছি সেখানে আমি আরো দেখার চেষ্টা করছি যে নতুন আর কোন কোন ক্ষেত্রে চায়না এবং বাংলাদেশ আরো বেশি সহযোগিতা করতে পারে।

নতুন নির্বাচিত সরকারের চীন সংক্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানতে চাই

বাংলাদেশ আসলে শুধু নতুন সরকার না, যে কোন সময়ের জন্যই বাংলাদেশ সবসময় চেষ্টা করে যেসব গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আমাদের যে ফরেন পলিসি সেখানে আমরা যে মেইন প্রিন্সিপালটা কাজ করে সেটা হচ্ছে আমাদের সবার সাথে বন্ধুত্ব। এই জায়গাটা এই নতুন সরকার তাদের নির্বাচনের যে মেনিফেস্টোতেও একই কথা বলেছে যে সবার সাথে বন্ধুত্ব এই ধরনেরই একটা পলিসি তারা ফলো করবে। তাই এই নতুন সরকারের ক্ষেত্রে সব দেশের সাথেই সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। আর চীনের সাথে আমাদের যেরকম গভীর সম্পর্ক, অর্থনৈতিক থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক, সামাজিক যোগাযোগ সম্পর্ক পর্যন্ত। বিশেষ করে সামাজিকের দিকে আমাদের ভিতরে অনেক মিল রয়েছে। আমি গত বেশ কয়েকদিন চীনে ছিলাম, আমি নিজে বোধ করেছি যে আমাদের কত সাংস্কৃতিক মিল থাকে। আমাদের অনেক সোশ্যাল নরমস ভ্যালু একই। এই এসব দিক থেকে চিন্তা করলে, আমার মনে হয় যে নতুন সরকারও এটা আমাদের যে সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তার কথা ভাববে।

চীনের পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা সম্পর্কে আপনার অভিমত

আমার মনে হয় যে এই সময় চীন ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ তৈরী করা খুবই বিচক্ষণ একটা উদ্যোগ। তার মানে সঠিক একটা উদ্যোগ হয়েছে। যে আসলে চায়না এখন তার উন্নয়নের যে পর্যায়ে রয়েছে এই সময়টা আসলে ওই উচ্চ মানের উন্নয়ন এবং জনগণের জীবন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ মান কিভাবে অর্জন করা যায় ওই জায়গাটাই মনোযোগ দেওয়া দরকার। এবং আমি এটা বললাম যে এই যে ডিজিটাল টেকনোলজি এবং রোবোটিক্স এসব বিষয়ে চায়নার যে অগ্রগতি এইটাকে আরো কিভাবে জনগণের কল্যাণে জনগণের উন্নয়নে জনগণের উন্নত জীবনের জন্য ব্যবহার করা যায়, সে জায়গাটাই মনোযোগ দেওয়া দরকার। এবং আমি মনে করি যে এই নতুন যে পাঁচসালা পরিকল্পনা এটাতে ওই জায়গাটাই সঠিক জায়গায় মনোযোগ দেয়া হয়েছে।

আমি আরেকটু নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। আমি যে চীনের হোটেলে থাকে সেখানে একটি স্মল রোবট ছিল। ওই ছোট রোবট খাবার পৌঁছে দেয়, ডেলিভারি যেগুলো আসে বিভিন্ন রুমে গিয়ে খাবার পৌঁছে দেয়। এটা খুবই ইন্টারেস্টিং একটা বিষয়। তারপর আমি চীনের নিউজ চ্যানেলে দেখলাম যে ওইখানে ছেলেরা প্র্যাকটিস করছে, সাথে রোবটদের সাথে মার্শালার প্র্যাকটিস করছে, মেয়েরা ডান্স প্রোগ্রাম করছে, সেখানে রোবটরা নাচছে। আমার মনে হয় যে আরো কিছু চীনের টিভি চ্যানেল যদি বাংলাদেশে প্রচার করা যায়, যদি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করে চীনের টিভি অনুষ্ঠান যদি নিয়ে আসা যায় তাহলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণও চীন সংক্রান্ত সর্বশেষ খবর জানতে পারবে।

চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়ে আপনার ধারণা?

চীন যে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ, বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ, বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগ এই চারটি উদ্যোগ উপস্থাপন করেছে এই চারটা উদ্যোগকে কিন্তু আসলে একটা আরেকটার সাথে কমপ্লিমেন্টারি বা পরিপূরক। আমি বলবো যে এটা অবশ্যই চীনের ক্ষেত্রে দরকারি, আর এটার সাথে আসলে আমাদের বাংলাদেশের যে উন্নয়নের উদ্যোকটা বা বাংলাদেশের উন্নয়ণ আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা সেটার সাথেও কিন্তু কমপ্লিমেন্টারি। চীনের সাথে বাংলাদেশ সম্পর্কের একটা শক্ত জায়গা হচ্ছে যে আমাদের নর্মস এন্ড ভ্যালুজ গুলো মিলে। আমরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলা তুলে ধরতে চায় বা যে বিষয়গুলাকে চায়না সমর্থন করে, বাংলাদেশেও ঠিক একই বিষয়গুলা সমর্থন করে। যেমন মাল্টিল্যাটারালিজম, চায়নাও চায় যে একটা মাল্টিল্যাটারাল গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্ক কাজ করুক। তারপর আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান, তারপর রুল বেস্ট একটা অর্ডার। বাংলাদেশে কিন্তু ঠিক এই একই ভ্যালুজ একই ধরনের বিষয়গুলা তুলে ধরতে চায় বা ১ ধরনের বিষয়গুলো সমর্থন করে। সেক্ষেত্রে আমি বলবো যে এগুলো আসলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা কমপ্লিমেন্টারি। আমরা এটাকে মানে মিউচুয়াল ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলেই মনে করি।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে একটা দেশের স্থিতিশীলতার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। সে ক্ষেত্রে চীন সবার থেকে এগিয়ে। আমরা দেখছি যে ইউএস ইসরাইল ইরান যে যুদ্ধটা চলছে সেই যুদ্ধের ভিতরে কিন্তু যে পরিমাণ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে সেটাতে বড় বড় পশ্চিমের দেশগুলো বড় বড় অন্যান্য যেসব অর্থনৈতিক দেশগুলো যতটা বেশি প্রভাবিত হয়েছে চীন কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে বিষয়টাকে এড্রেস করতে পারছে। চীন সারা বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। পুরো বিশ্বের আমাদের মত যেসব উন্নয়নশীল দেশ আছে তাদের জন্য কিন্তু একটা উদাহরণ। যে কোন দেশের আসলে বিশ্বে তার অবস্থান তৈরি করার ক্ষেত্রে, তার নিজের যে স্বার্থগুলি সুরক্ষা করার ক্ষেত্রে সবার আগে দরকার হচ্ছে তার নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা। তাই আমি মনে করি, ওইখানে চায়না একটা স্থিতিশীলতা শক্তি, বিশ্বে তার একটা বিশাল অবদান রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *