নামজারির কাগজে যতটুকু জমির নিশ্চয়তা মেলে - Mati News
Wednesday, October 28

নামজারির কাগজে যতটুকু জমির নিশ্চয়তা মেলে

মহিউদ্দিন সরকার অভি

একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় কখনো একটি ফাইলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ফাইলে দলিলের কপি, খতিয়ান, নামজারির কাগজ। বিক্রেতা নিশ্চিন্ত; ক্রেতাও নিশ্চিন্ত হতে চান। ঠিক এই সময় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্নটি চাপা পড়তে পারে: হাতে থাকা প্রতিটি কাগজ আসলে কতটুকু নিশ্চয়তা দিচ্ছে? জমি কেনার ঝুঁকি অনেক সময় নথির অভাবের পাশাপাশি নথির অর্থ না বোঝা থেকেও শুরু হয়।

নামজারি ভূমির রাজস্ব রেকর্ড হালনাগাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু সেই কাজ সম্পন্ন হলেই বিক্রেতার মালিকানার সব প্রশ্ন নিষ্পত্তি হয় না। আগের হস্তান্তর, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কারও অধিকারের সমস্যা থাকলে তা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে। একটি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নথির ওপর তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি আস্থা রাখলে যাচাই ঠিক যেখানে গভীর হওয়া দরকার, সেখানেই থেমে যায়।

নুর মোহাম্মদ বনাম আসেন আলী ও অন্যান্য মামলায়, ফার্স্ট মিসলেনিয়াস আপিল ৩৫৬/২০১৫, হাইকোর্ট বিভাগ নামজারি নিজে মালিকানা সৃষ্টি করে না বলে উল্লেখ করেছেন। ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ সালের ওই রায় নামজারি ও মালিকানা নির্ধারণের পার্থক্য বোঝার একটি প্রাসঙ্গিক উৎস। এর অর্থ অবশ্য নামজারির কাগজ মূল্যহীন নয়; অর্থ হলো, ওই কাগজের আইনি ভূমিকা সীমিত।

ধরা যাক, বিক্রেতার নামে নামজারি আছে, অথচ যাঁর কাছ থেকে তিনি জমি পেয়েছেন, তাঁর হস্তান্তরের ক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে। সর্বশেষ কাগজটি তখন আগের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখতে হয় এই কারণেই। ফাইলের সবচেয়ে নতুন পাতাটি সুন্দর ও পরিষ্কার হলেই আগের পাতাগুলোর দুর্বলতা দূর হয় না।

একইভাবে, কাগজে বর্ণিত জমি ও সরেজমিনে দেখানো জমি মেলে কি না, তা যাচাই জরুরি। দাগ, খতিয়ান, পরিমাণ ও সীমানার অসংগতি একটি ফটোকপির পরিপাটিতায় ধরা পড়ে না। ক্রেতাকে যে জায়গায় দাঁড় করিয়ে জমি দেখানো হচ্ছে, তিনি আসলে সেটিই কিনছেন কি না—এই সরল প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর চাই। দৃশ্যমান দখলকেও একা মালিকানার সম্পূর্ণ প্রমাণ ভাবা চলে না।

ক্রেতার পক্ষে সব আইনি সমস্যা নিজে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই বড় অঙ্কের মূল্য পরিশোধ বা বাধ্যতামূলক চুক্তির আগে যোগ্য আইনজীবীর মাধ্যমে নথি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনমতো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রেকর্ড যাচাই করা যুক্তিসংগত। যাচাইয়ের বিষয় সম্পত্তিভেদে বদলাবে; কোনো ছোট তালিকাকে সব জমির জন্য সম্পূর্ণ আইনি মতামত ধরে নেওয়া যাবে না।

এখানে শুধু ক্রেতাকে সতর্ক করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ভূমিসেবার কাগজ ও অনলাইন পর্দায় এমন সহজ ব্যাখ্যা থাকা উচিত, যাতে মানুষ বুঝতে পারেন কোন সেবা কী নিশ্চিত করে এবং কী করে না। নামজারির ফলাফলের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা থাকলে একটি প্রশাসনিক অনুমোদনকে সম্পূর্ণ মালিকানা যাচাই হিসেবে ভুল করার আশঙ্কা কমতে পারে।

অনলাইন সেবায় সফল লেখা দেখলে মানুষের স্বস্তি আসে। কিন্তু কোন কাজটি সফল হলো, সেটিও একই সঙ্গে স্পষ্ট হওয়া দরকার। আবেদন প্রক্রিয়াকরণ শেষ হওয়া আর সম্পত্তির সব বিরোধের নিষ্পত্তি আলাদা বিষয়। পর্দার একটি সবুজ সংকেত যেন যাচাই বন্ধ করার সংকেত না হয়ে দাঁড়ায়। ডিজিটাল সেবার নির্ভরযোগ্যতার অংশ হলো তার ফলের সীমা মানুষকে বুঝতে দেওয়া।

দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্যের অসামঞ্জস্যও ব্যবহারকারীর সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার। কোনো রেকর্ড যাচাই হয়নি কিংবা সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না, সেটি লুকিয়ে নিশ্চিন্ত করার চেয়ে সীমাবদ্ধতা জানানো ভালো। তবে ব্যক্তিগত তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়াই সমাধান নয়। কার জন্য কোন তথ্য প্রয়োজন এবং আইনসম্মতভাবে কতটুকু দেওয়া যাবে, তা বিবেচনায় রাখতে হবে।

দলিল তৈরির খরচ দৃশ্যমান, ভুল কেনাকাটার ভবিষ্যৎ খরচ তখনো অদৃশ্য। ফলে আগাম আইনি যাচাইকে বাড়তি ব্যয় মনে হতে পারে। অথচ সঞ্চয় আটকে গেলে পরবর্তী মামলা ও অনিশ্চয়তা পরিবারের ওপর অনেক বড় চাপ ফেলে। সহজলভ্য প্রতিরোধমূলক আইনি সেবা এই ভুল হিসাব বদলাতে পারে; বিরোধ তৈরি হওয়ার আগেই সঠিক প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেয়।

স্থানীয় পর্যায়ে সহজ ভাষার ভূমি-সচেতনতা কার্যক্রম এ কাজে সাহায্য করতে পারে। সেখানে মানুষকে ভয় দেখানোর বদলে নথির পৃথক ভূমিকা বোঝাতে হবে। কোনো দপ্তর, দালাল বা বিক্রেতার আশ্বাসকে যাচাইয়ের বিকল্প হিসেবে না নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

জমি কেনার দিন মানুষ সাধারণত নতুন জীবনের কথা ভাবেন; ভবিষ্যতের মামলার কথা ভাবতে চান না। সেই স্বপ্নের নিরাপত্তার জন্যই কাগজ দেখে আরও প্রশ্ন করা দরকার। নামজারি আছে—এটি আশ্বাসের একটি অংশ। বিক্রেতার অধিকার কোথা থেকে এসেছে, নথিগুলো পরস্পরের সঙ্গে মেলে কি না এবং কেনার আগে কী যাচাই বাকি, তার উত্তরেই সেই আশ্বাসের প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে।

মহিউদ্দিন সরকার অভি, এলএলবি (অনার্স), এলএলএম (অধ্যয়নরত), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *