Thursday, April 3

ঐতিহ্যের ধারায় বাঘার ঈদ মেলার বৈচিত্র্য

উম্মে কুলসুম জাহান : ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দকে আরও রঙিন করে তোলে ঈদ মেলা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ উপলক্ষে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও রাজশাহীর বাঘার ঈদ মেলা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় আয়োজনের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় পাঁচশত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে চলেছে এই মেলা, যা শুধু বাঘাবাসীর নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষের ঈদের আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।

ঐতিহাসিকভাবেই বাঘা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন নগরী হিসেবে পরিচিত, যেখানে ইতিহাসের বিভিন্ন স্তর আজও দৃশ্যমান। এখানেই অবস্থিত ১৫২৩-২৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বিখ্যাত বাঘা শাহী মসজিদ। সুলতান নুসরাত শাহ নির্মিত এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, স্থাপত্যশিল্পের জন্যও অনন্য। এই মসজিদের পাশেই ঈদ মেলার সূচনা হয়েছিল, যা সময়ের পরিক্রমায় বৃহৎ আকার ধারণ করেছে।

প্রতি বছর মাজার পরিচালনা কমিটি এই মেলার দায়িত্ব নেয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদনক্রমে এটি পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালে মাজার কর্তৃপক্ষ মেলাটি ১২ লাখ টাকা ইজারায় দেন, যা মেলার বিস্তৃতি ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের প্রমাণ। তবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মাঝে কিছু বাধার সম্মুখীন হয়েছে এই মেলা। করোনা মহামারির কারণে টানা তিন বছর এবং রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে আরও এক বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালে এটি পুনরায় চালু হয়, যা স্থানীয়দের জন্য আনন্দের বিষয়।

ঈদ মেলাটি মূলত ঈদের দিন থেকে শুরু হয়ে প্রায় এক মাস ধরে চলে। তবে এই বছর ৭ দিন ব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ঈদের ১০ দিন আগ থেকেই মেলার প্রস্তুতি শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে জমজমাট হয়ে ওঠে। এখানে বসে নানান রকমের দোকান, যেখানে পাওয়া যায় হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী, বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও পোশাক, পাশাপাশি নানা ধরনের মিষ্টান্ন ও স্থানীয় খাবার। তবে মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো বিনোদনমূলক আয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাগরদোলা ও রোলার কোস্টার, সার্কাস ও কৌতুক প্রদর্শনী, মৃত্যুকূপে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার খেলা, পুতুলনাচ ও যাত্রাপালা। এসব আয়োজন মেলায় অংশগ্রহণকারীদের বিনোদিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতির চিত্রও তুলে ধরে।

বাঘার ঈদ মেলা কেবল বিনোদন কিংবা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বাঘা শাহী মসজিদের পাশাপাশি এখানে রয়েছে একটি বিশাল দীঘি, যার স্বচ্ছ জল এবং চারপাশের পরিবেশ ভ্রমণপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে। এছাড়া অসংখ্য শাহ সুফীর মাজার ও পবিত্র কবর রয়েছে, যা ধর্মীয় পর্যটনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ইতোমধ্যে বাঘা শাহী মসজিদকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ঈদ মেলাকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মেলার সময় হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসেন, কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় অনেকেই সমস্যায় পড়েন। যদি সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগ নেয়, তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

এই মেলা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক মাসব্যাপী মেলাকে কেন্দ্র করে শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের পণ্য বিক্রি করেন, যা স্থানীয় ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করে। বিশেষ করে হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প ও তাঁতশিল্পের কারিগররা এই মেলাকে কেন্দ্র করেই সারা বছরের একটি বড় অংশের আয় নিশ্চিত করেন। এছাড়া মেলা সামাজিক সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। এটি কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি একটি মিলনমেলাও, যেখানে শহর ও গ্রামের মানুষ একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ করেন।

যদিও বাঘার ঈদ মেলা একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, তবুও এর ব্যবস্থাপনায় কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। লাখো মানুষের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পর্যাপ্ত আবাসন, পার্কিং ও বিশ্রামের জায়গার অভাব পর্যটকদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। অনেক সময় পকেটমার, প্রতারক চক্র ও অন্যান্য অনৈতিক কার্যকলাপ বেড়ে যায়, যা মেলার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ, র‍্যাব ও স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা প্রয়োজন। পর্যটকদের জন্য আলাদা পার্কিং, বিশ্রামাগার এবং পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা উচিত। ইজারা ব্যবস্থাপনা, দোকানপাটের মূল্য নির্ধারণ ও প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা বাড়ানোর জন্য সরকারের উচিত পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া।

ঈদ মেলা শুধুমাত্র আনন্দের উপলক্ষ নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, যা বংশপরম্পরায় বহমান। সময়ের বিবর্তনে এর রূপ বদলেছে, তবে সারমর্ম রয়ে গেছে আগের মতোই। এটি কেবল বাঘাবাসীর নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এই মেলাকে আরও আকর্ষণীয় ও সমৃদ্ধ করে তোলা সম্ভব, যা দেশীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। 

দর্শন বিভাগ, রাজশাহী কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *