শসা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে জনপ্রিয় একটি সবজি। গরমের দিনে সালাদ, ভর্তা কিংবা নানা পদে শসার ব্যবহার বেশ পরিচিত। তবে অনেকেই মনে করেন শসা চাষ করতে হলে বড় জমি দরকার। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। সামান্য বারান্দা, ছাদ কিংবা উঠোনে একটি পাত্রেও সহজেই শসা চাষ করা যায়। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে পাত্রে লাগানো একটি শসা গাছ থেকেই মিলতে পারে প্রচুর ফলন।
অনেক নতুন উদ্যানপ্রেমী প্রথম দিকে শসা চাষে হতাশ হন। কখনো ফল ধরে না, কখনো ফল তেতো হয়, আবার কখনো গাছই ভালোভাবে বাড়ে না। কিন্তু কয়েকটি বিষয় ঠিকভাবে মেনে চললে এসব সমস্যা সহজেই এড়ানো যায়। এখানে পাত্রে শসা চাষের জন্য এমন ৯টি কার্যকর পরামর্শ তুলে ধরা হলো, যা অনুসরণ করলে আপনার বাগানেও মিলতে পারে স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু শসার প্রাচুর্য।
উপযুক্ত জাত নির্বাচনই সাফল্যের প্রথম ধাপ
পাত্রে শসা চাষের ক্ষেত্রে জাত নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এমন জাত বেছে নেওয়া ভালো, যেগুলোতে স্ত্রী ফুল বেশি হয় এবং যেগুলো ফল ধরার জন্য পরাগায়নের ওপর নির্ভর করে না। এ ধরনের জাতকে বলা হয় গাইনোসিয়াস ও পার্থেনোকার্পিক। এসব গাছে অধিকাংশ ফুলই স্ত্রী ফুল হওয়ায় ফলন তুলনামূলক বেশি হয়। পাশাপাশি পরাগায়নের জন্য মৌমাছি বা অন্যান্য পোকামাকড়ের উপস্থিতি না থাকলেও ফল ধরতে পারে।

অপ্রয়োজনীয় ছাঁটাই না করাই ভালো
অনেকে শসা গাছের পাশের ডাল বা ‘সাকার’ কেটে ফেলেন। কিন্তু পাত্রে চাষের ক্ষেত্রে সব সময় এটি প্রয়োজন হয় না। পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে সাকার রেখে দিলে গাছ আরও শক্তিশালী হয় এবং অনেক সময় ফলনও বাড়ে। খুব ঘন করে গাছ লাগানো হলে বা রোগের ঝুঁকি থাকলে তখন ছাঁটাই করা যেতে পারে।
শসা গাছের জন্য প্রচুর পানি দরকার
শসা গাছের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রচুর পানি চায়। অনেকেই টমেটোর মতো কম পানি দিয়ে শসা চাষ করার চেষ্টা করেন, যা বড় ভুল। এতে গাছ দুর্বল হয়ে যায় এবং ফল তেতো হতে পারে। গরমের সময় পাত্রের মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে দিনে একাধিকবারও পানি দিতে হতে পারে।
মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পাত্রের মাটিতে পিট মস বা কোকো কয়ার মেশানো যেতে পারে। এতে মাটি দীর্ঘ সময় ভেজা থাকে এবং গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।
নিয়মিত সার প্রয়োগ করা জরুরি
পাত্রে চাষ করা গাছ মাটির তুলনায় দ্রুত পুষ্টি হারায়। কারণ পানি দেওয়ার সময় মাটির পুষ্টি অনেকটাই ধুয়ে বের হয়ে যায়। তাই শসা গাছের জন্য নিয়মিত সার প্রয়োগ করা জরুরি। চারা লাগানোর আগে পাত্রের মাটিতে সামান্য জৈব সার মিশিয়ে নেওয়া ভালো। এরপর প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর হালকা মাত্রায় সবজি সার ব্যবহার করলে গাছ সুস্থ থাকে এবং ফলন বাড়ে।
ট্রেলিস ব্যবহার করলে বাড়ে ফলন
শসা একটি লতানো গাছ। মাটিতে ছড়িয়ে বাড়লেও এটি ট্রেলিস বা জালের সাহায্যে ওপরে উঠিয়ে চাষ করা গেলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। এতে গাছ পরিষ্কার থাকে, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং ফল সংগ্রহ করাও সহজ হয়। পাত্রে চাষের ক্ষেত্রে ট্রেলিস ব্যবহার করলে গাছের জায়গাও কম লাগে।
শুধু ছোট জাতেই সীমাবদ্ধ থাকার প্রয়োজন নেই
অনেকে মনে করেন পাত্রে শসা চাষ করতে হলে শুধু ছোট ‘বুশ’ জাত লাগাতে হবে। বাস্তবে মাঝারি বা বড় লতানো জাতও পাত্রে ভালোভাবে জন্মাতে পারে। প্রায় ৭ থেকে ১০ গ্যালনের একটি পাত্রে বড় আকারের শসা গাছও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে, যদি পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি দেওয়া হয়।
চারা তৈরি করে লাগানোও সম্ভব
সাধারণত শসার বীজ সরাসরি পাত্রে বপন করা হয়। তবে আগে ছোট পাত্রে চারা তৈরি করে পরে বড় পাত্রে প্রতিস্থাপন করলেও ভালো ফল পাওয়া যায়। এতে চারা ছোট অবস্থায় সহজে যত্ন নেওয়া যায় এবং বড় পাত্রের মাটিতে সেটি দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে।
সাদা মাছি দমনে সহজ পদ্ধতি
শসা গাছে সাদা মাছির আক্রমণ অনেক সময় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এসব পোকা গাছের ক্ষতি করার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগও ছড়ায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় বিষমুক্ত স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। হলুদ বা নীল রঙের এই আঠালো ফাঁদ পোকা আকর্ষণ করে এবং সহজেই তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
পূর্ণ রোদে রাখুন শসা গাছ
শসা গাছের ভালো বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক প্রয়োজন। দিনে কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি রোদ পাওয়া উচিত। অনেক সময় অতিরিক্ত গরমের ভয়ে গাছকে ছায়ায় রাখা হয়, কিন্তু এতে গাছ লম্বা হলেও দুর্বল হয়ে যায় এবং ফলন কমে যায়। খুব বেশি গরম হলে শেড নেট ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে গাছকে পুরোপুরি ছায়ায় রাখা ঠিক নয়।
শেষ কথা
শসা চাষ তুলনামূলক সহজ হলেও কয়েকটি ছোট ভুলের কারণে অনেক সময় প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায় না। সঠিক জাত নির্বাচন, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত সার এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক নিশ্চিত করতে পারলে পাত্রেই মিলতে পারে প্রচুর শসা। শহরের ছাদ বা বারান্দা বাগানের জন্য তাই শসা একটি আদর্শ সবজি। সামান্য যত্নেই এটি আপনার ছোট বাগানকে করে তুলতে পারে সবুজ ও ফলনসমৃদ্ধ।




















