মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
লাভবার্ড হলো ছোট, বাহারি রঙের চঞ্চল পাখি। এদের মূল নিবাস আফ্রিকা ও মাদাগাস্কার। প্রজাতিগত নাম আগাপোরনিস। এদের ওজন সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম, আর লম্বা ৫–৭ ইঞ্চি বা ১৩–১৭ সেন্টিমিটার। লাভবার্ডের আয়ু প্রায় ২০ বছর এবং লেজের দৈর্ঘ্য ১–১.৫ ইঞ্চি। এই পাখির রোগ-বালাই খুব কম হয়। এরা খাঁচায় সুন্দরভাবে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা করে। জীবন বৈচিত্র্যময় ও মনোজ্ঞ, যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। এসব কারণে লাভবার্ড এখন সকলের প্রিয় পাখির মধ্যে একটি। এবার জেনে নিন লাভবার্ড পালনের নানা খুঁটিনাটি বিষয় এবং যত্ন-আত্তি, যা এই সুন্দর পাখিকে সুস্থ ও দীর্ঘায়ু রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

খাঁচার পাখি লাভবার্ড
লাভবার্ডকে খাঁচার পাখি বলা হয়। কারণ এরা খাঁচায় থাকতে পছন্দ করে। খাঁচায় থাকা, খাওয়া, ডিম, বাচ্চা করতে এরা পছন্দ করে। লাভবার্ডের খাঁচার আদর্শ মাপ: ৩৬*২৪*২৪; তবে ২৪*২৪*২৪ অথবা ১৮*১৮*২৪ ইঞ্চি হলেও অসুবিধা নেই। মরিচা পড়া খাঁচা ব্যবহার করা যাবে না। অনেক সময় লাভবার্ড তাদের দর্শনীয় ঠোঁট দিয়ে খাঁচা কামড়ে ধরে থাকে।
লাভবার্ড কোথায় পালন করবেন
বারান্দা বা ছাদে, এমনকি আপনার রুমের এক কোনায়ও খাঁচায় লাভবার্ড পালন করতে পারবেন। বিদেশীরাও ঘরের মধ্যে লাভবার্ড পালন করে থাকে। তবে এমন জায়গা বেছে নিন যেখানে আলো-বাতাস ভালো আসে। ছায়াযুক্ত ,শ্যাতশ্যাতে জায়গা পরিহার করুন।
লাভবার্ডের খাবার
লাভবার্ডের প্রধান খাবার হলো সিড মিক্স (পরিমানমতো চিনা, কাউন, সূর্যমুখীর বীজ, কুসুম ফুলের বীজ, ধান, তিসি, গম, গুজি তিল ইত্যাদি মিশিয়ে বানানো হয়)। সিড মিক্স তৈরির বিভিন্ন অনুপাত আছে, যেমন: চিনা ৩ কেজি, কাউন ১ কেজি ৫০০ গ্রাম,সূর্যমুখীর বীজ ২৫০ গ্রাম,পোলাউর চালের ধান ১ কেজি ৫০০ গ্রাম,ক্যানারী ১ কেজি,গুজি তিল ২০০ গ্রাম,হেম্প সিড ২০০ গ্রাম,সিড মিক্সের পাশাপাশি কলমি শাক, পালং শাক, লাল শাক, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, কাচা মরিচ, সজনে পাতা, ধনে পাতা, বরবটি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ভাঙা ভুট্টা সিদ্ধ, বুটের ডাল সিদ্ধ (মাঝে মাঝে) দেওয়া ভালো। শীতকালে সিড মিক্সে সূর্যমুখীর বীজ একটু বেশি দেয়া উত্তম। এছাড়া মধু ও আপেল সিডার ভিনেগার পানিতে মিশিয়ে দিলে পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। গোসলের পানিতে এলোভেরা বা ঘৃতকুমারী দিলে পোকার আক্রমণ কম হয়। ড্রাই এগ ফুড কিনে বা বাসায় বানিয়ে দিলে পাখি সুস্থ ও সবল থাকে।

এগ ফুড বানানোর সহজ রেসিপি:
১টি ডিম (দেশী মুরগীর হলে ভালো) সিদ্ধ, শাক বা সবজি (কুমড়া, পটল, ঝিঙ্গা, সীম, আমড়া ইত্যাদি) ধুয়ে ছোট করে কাটা। ডিম ও শাক মিশিয়ে দিলে সম্পূর্ণ এগ ফুড তৈরি। কাচা শাক ভালো, সিদ্ধ করলে পুষ্টিমান কমে যায়।
দ্রষ্টব্য: চকলেট, লবণ, মাশরুম, পেঁয়াজ, আপেলের বীজ লাভবার্ডকে দেওয়া যাবে না।

লাভবার্ডের ব্রিডিং (বাচ্চা করানো)
এক বছর বয়স হলে লাভবার্ডের ব্রিডিং বা ডিম-বাচ্চা করানো উত্তম। বছরে দুই থেকে তিনবার বাচ্চা করানো যায়। বাকী সময় পাখি বিশ্রামে থাকে। অনেক সময় পাখি ডিম দেয় কিন্তু বাচ্চা হয় না। কারণগুলো হতে পারে: ক্যালসিয়ামের অভাব, সঠিকভাবে পেয়ার না মেলা, বয়স কম, দুইটি মেয়ে পাখি, আদ্রতার অভাব, ডিমে যথাযথ যত্ন না দেওয়া, পরিবেশ অনিরাপদ মনে করা, খাঁচা নড়বড়ে হওয়া, পাখি ভয় পেলে, ডিম পাড়ার সময় সঠিকভাবে মেটিং না হওয়া ইত্যাদি। ব্রিডিং খাঁচার মাপ: লম্বা ৮ ইঞ্চি, চওড়া ৬ ইঞ্চি, উচ্চতা ৬ ইঞ্চি।
বাসা তৈরির জন্য: খেজুর পাতার ঝাড়ু দিতে হবে।
পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা
সপ্তাহে একবার খাঁচা পরিস্কার করা উচিত। অপরিষ্কার খাঁচায় রোগ-বালাই বাড়ে। পানির পাত্র প্রতিদিন রাতে ধুয়ে রেখে দিতে হবে। সকালে নতুন পানি দেওয়া উচিত। ঘরে বানানো এগ ফুড নষ্ট হওয়ার আগে সরিয়ে ফেলুন। ড্রাই এগ ফুড দীর্ঘদিন সময় খাচায় রাখা যায়। খাঁচায় বাটিতে পানি রাখুন, পাখি নিজে সময়মতো গোসল করবে।

লাভবার্ডের অসুখ এবং ওষুধপত্র
লাভবার্ড সাধারণত শক্ত পাখি। তেমন রোগ-বালাই হয় না। মাঝে মাঝে বদ হজম বা পাতলা পায়খানা হতে পারে। মাইটসের আক্রমণও হতে পারে। ঠান্ডা লাগলে মধু, আদা, তুলশি পাতা, পুদিনা পাতা, অপরোশোধিত আপেল সিডার ভিনেগার দিতে পারেন। আঘাতপ্রাপ্ত হলে আঘাতের স্থানে এলোভেরা জেল লাগান। এটি ব্যথা কমায় ও ক্ষত দ্রুত সারায়। যে কোনো সমস্যায় ছবি তুলে ফেসবুকের পাখি গ্রুপে পোস্ট করলে অভিজ্ঞরা বিনামূল্যে পরামর্শ দেয়।
লাভবার্ড কোথায় পাবেন
পাখির দোকান, হাট, কাটাবন ইত্যাদিতে জায়গায় পাওয়া যায়। এছাড়া সরাসরি ব্রিডারের কাছে গিয়ে কিনতে পারেন। ব্রিডারদের ফেসবুকের পাখি গ্রুপে খুঁজে পাওয়া যায়। লক্ষ্য রাখবেন: আমদানিকৃত নয়, দেশের উৎপাদিত লাভবার্ড কিনুন। আমদানিকৃত পাখি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কম দামে হলেও ওই সব কেনা উচিত নয়। পাখি ক্রয় করার আগে ব্রিডারের সম্পর্কে খোজ খবর নিন। ডিএনএ পেপারসহ কিনবেন।




















