গ্রামে-গ্রামে সংযোগ: চীনা উন্নয়নের নীরব সূত্র - Mati News
Wednesday, March 18

গ্রামে-গ্রামে সংযোগ: চীনা উন্নয়নের নীরব সূত্র

ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক রাজনৈতিক আয়োজন—‘দুই অধিবেশন’। এই সময়ে একটি প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হয়: কীভাবে এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন? উত্তর খুঁজতে বিশাল অট্টালিকা বা দ্রুতগতির ট্রেনের দিকে তাকালেই হবে না—দৃষ্টি নামাতে হবে মাটির কাছাকাছি, গ্রামবাংলার ভেতরে, যেখানে নিঃশব্দে লেখা হয়েছে এক অনন্য উন্নয়নের কাহিনি।

চীনের পরতে পরতে পাওয়া যাবে এমন সব বিনিয়োগ—যেখানে লাভের অঙ্ক মেলানো যায় না। পশ্চিমা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে যা বলতে গেলে ‘অযৌক্তিকেই। কিন্তু চীন ঠিক এই পথেই হেঁটেছে—দশকের পর দশক ধরে। দেশটি বিপুল অর্থ ব্যয় করে গড়ে তুলেছে ‘গ্রামে-গ্রামে সংযোগ’ প্রকল্প—যা আজ মানব উন্নয়নের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

D:\xwechat_files\wxid_mpi8ox0myfqm22_bb5d\temp\RWTemp\2026-03\9e20f478899dc29eb19741386f9343c8\c0599c14c5b3d2c901e633c1c610d47d.png

চীনের অবকাঠামো শক্তির কথা উঠলেই চোখে ভেসে ওঠে ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতির বুলেট ট্রেন, সমুদ্রের ওপর বিস্তৃত হংকং-চুহাই-ম্যাকাও সেতু, কিংবা বিশাল থ্রি গর্জেস ড্যামের ছবি। এগুলো উন্নয়নের কিছু প্রতীক। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত শক্তি কোনো স্থাপনার ওপর নির্ভর করে না, করে ভিত্তির ওপর। সেই ভিত্তিকে দৃঢ় করেছে এই প্রকল্প।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্য বলছে, চীনের গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৪৬ লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটার ছাড়িয়েছে। দেশের প্রায় ৩০ হাজার শহর ও ৫ লাখের বেশি গ্রাম পাকা সড়কের আওতায় এসেছে। এই বিশাল নেটওয়ার্ক যেন এক জীবন্ত জাল—যা ৯৬ লাখ বর্গকিলোমিটার জুড়ে প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। এমনকি গোবি মরুভূমির শুষ্কতা কিংবা খাড়া পাহাড়ের চূড়াও এর বাইরে নয়।

এই পথ এত সহজ ছিল না। একসময় পশ্চিম চীনের অনেক গ্রাম ছিল বিচ্ছিন্ন। সিছুয়ানের আতুলিয়ার গ্রামে মানুষ চলাচল করত বেতের মই বেয়ে। ৮০০ মিটারের খাড়া ঢাল বাইতে হতো কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই। শিশুদেরও স্কুলে যাওয়া ছিল বিরাট ঝুঁকি। ইয়ুননানের নুচিয়াং নদীতে মানুষ পার হতো জিপলাইনের মাধ্যমে। ঠিক যেন প্রতিদিনই মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া।

D:\xwechat_files\wxid_mpi8ox0myfqm22_bb5d\temp\RWTemp\2026-03\9e20f478899dc29eb19741386f9343c8\c000b3dd5989b6a282c950f08774f5a3.png

অর্থনীতির ক্যালকুলেটরেও দেখা যেত না কোনো ভরসা। কেউ কেউ বলতো এখানে রাস্তা নির্মাণ অর্থহীন। কয়েক ডজন পরিবারের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলে তা ফেরতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু চীনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তারা বলেছে, উন্নয়নের হিসাব কেবল মুনাফায় সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনমানই এর কেন্দ্রবিন্দু। আপনি পাহাড়ের চূড়ায় থাকুন কিংবা মরুভূমির গভীরে—রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল আপনার কাছেও পৌঁছাতে হবে।

এই দর্শন থেকেই জন্ম নিয়েছে বাস্তব পরিবর্তন। আতুলিয়ার গ্রামে নির্মিত হয়েছে ২৫৫৬ ধাপের ইস্পাত সিঁড়ি, পরে গ্রামবাসীদের স্থানান্তর করা হয়েছে আধুনিক আবাসনে। নুচিয়াং নদীর ওপর তৈরি হয়েছে মজবুত সেতু—যেখানে একসময় ছিল ঝুঁকিপূর্ণ তার, এখন সেখানে নিরাপদে চলাচল করে মোটরযান।

তবে এই প্রকল্প শুধু রাস্তা নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন ব্যবস্থা—যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, পানি সরবরাহ এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ক। আগে দুর্গম এলাকার কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পেরে নষ্ট হয়ে যেত। এখন সেই কৃষক স্মার্টফোনে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

C:\Users\yuguangyue\Pictures\06b7d762f24553e74f59a39f66211709.jpg

এই উদ্যোগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এটি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। যেখানে বাজার পৌঁছাতে পারে না, সেখানে সরকার এগিয়ে আসে। যেখানে বিনিয়োগকারীরা সরে যায়, সেখানে রাষ্ট্র মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ফলে ‘গ্রামে-গ্রামে সংযোগ’ প্রকল্প শুধু অবকাঠামো নয়—এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মডেল।

আজ ৪৬ লাখ কিলোমিটারের এই সড়ক নেটওয়ার্ক শুধু একটি সংখ্যা নয়—এটি এক আবেগঘন বাস্তবতা। এটি প্রমাণ করে, উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো কাউকে পিছনে না ফেলে এগিয়ে যাওয়া। কোনো গ্রাম যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে না থাকে—এই প্রতিজ্ঞাই চীনের উন্নয়নের ভিত্তি।

এই গল্প তাই কেবল সড়কের নয়; এটি মানুষের, সম্ভাবনার, এবং এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির গল্প—যেখানে উন্নয়ন মানে সবার জন্য অগ্রগতি।

লেখক: পরিচালক, সিএমজি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *