ফয়সল আবদুল্লাহ
কয়েক মিনিটের ইনপুট এখন এমন কাজ করে দিতে পারে, যা আগে করতে সপ্তাহ লেগে যেত। অ্যাসসিও ওয়ার্ক নামের একটি এআই টুলে ব্যবহারকারীরা শুধু পণ্যের মৌলিক তথ্য দিলে মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব। এই সিস্টেম বাজারের বিশেষ তথ্য, সামাজিক মাধ্যমের সংকেত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সরবরাহকারী খুঁজে দেয়, তাদের যোগ্যতা তুলনা করে এবং এমনকি প্রাথমিক অনুসন্ধানী ইমেইলও তৈরি করে দেয়।
যে কাজগুলো আগে বারবার খোঁজা, বাছাই করা এবং দরকষাকষির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হতো, সেগুলো এখন একটি ধারাবাহিক ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় রূপ নিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য এখন আর পুরোপুরি ম্যানুয়াল ধাপের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সাল থেকেই এআই এজেন্টগুলোর কাজ বড় পরিসরে দেখা দিতে শুরু করে। ২০২৬ সালে এই প্রযুক্তি বাণিজ্য অবকাঠামোর অংশ হয়ে গেছে।
চীনা রপ্তানিকারকরা এই পরিবর্তনের বাস্তব ফল পাচ্ছেন। বিভিন্ন কাজভিত্তিক এআই সিস্টেম এখন ব্যবসার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত অনুসন্ধানের জবাব,নতুন বাজার খোঁজা এবং জটিল লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা আরও নির্ভুলভাবে সামলাতে পারে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুারোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীনের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।
রপ্তানি পণ্যের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক পণ্য এখনো প্রধান অবস্থানে রয়েছে। এই খাতে রপ্তানির পরিমাণ ৬২০ বিলিয়ন ডলার। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, স্টোরেজ এবং বিদ্যুৎ সরঞ্জামের রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে।
এই প্রবণতার সঙ্গে এআই প্রযুক্তির বিস্তারের একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এর প্রথম বড় প্রভাব হলো ডিজিটালাইজেশন। এটি শুধু ই-কমার্স বা অনলাইন লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পণ্য নকশা, কাঁচামাল সংগ্রহ, লজিস্টিক সমন্বয় এবং বাজার বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখন শুধু পণ্য সংগ্রহ নয়, কাস্টমস প্রক্রিয়া, চুক্তি তৈরির কাজ, ভাষান্তর এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ছোট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাজারে প্রবেশ করা সহজ হচ্ছে।
প্রযুক্তির দিক থেকেও আরেকটি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে। এসব ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য শুধু উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ নয়, বরং উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরি, সার্ভার, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মতো বড় একটি শিল্পব্যবস্থা প্রয়োজন।
এই পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও নতুনভাবে গড়ে উঠছে। উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরির চাহিদা বাড়ায় প্রচলিত ডিআরএএম মেমোরির সরবরাহ কিছুটা কমেছে এবং বাজারে দামও বেড়েছে।
এআই-সম্পর্কিত পণ্য এখন সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে উন্নত সার্ভার পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে চীনের ভূমিকা মূলত সহায়ক স্তরে—যেমন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, উপাদান ও অবকাঠামোগত সরঞ্জাম উৎপাদনে।
তবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবেশ একই সঙ্গে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ৮০০ ডলারের নিচের পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউও ১৫০ ইউরোর নিচের ছোট পার্সেলের করমুক্ত সুবিধা বাতিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমও চালু হয়েছে, যার আর্থিক প্রভাব ২০২৭ সাল থেকে আরও বাড়তে পারে।
এআই সিস্টেম বিভিন্ন দেশের নিয়মনীতি, বাজারের পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতা সামলাতে সাহায্য করছে। ফলে ব্যবসা দ্রুত ও কম ভুল নিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
সব মিলিয়ে চীনের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার ধরনও বদলাচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন দেশের নিয়মের মধ্যে সহজে কাজ করার দক্ষতা।
অর্থাৎ বৈদেশিক বাণিজ্য থেমে যায়নি; বরং তার ধরন বদলাচ্ছে। পণ্যের পাশাপাশি এখন চলাচল করছে বিপুল ডেটা, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক সমন্বয়।
সূত্র: সিএমজি বাংলা





















