কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেমন বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ব্যবস্থা ও জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক দক্ষিণ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই-এর সম্ভাবনা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে চীন-বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সুশাসন’ শীর্ষক এই সেমিনারে দুই দেশের শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা এআই প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। থোংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসের পরিচালক ছেন ইলি অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
সেমিনারে বক্তারা উল্লেখ করেন, এআই প্রযুক্তি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে। তবে এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধীরগতি, ডিজিটাল বিভাজন, কর্মসংস্থান হারানো এবং নৈতিক ঝুঁকির মতো সমস্যাগুলো প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো যখন এই প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করছে, তখন বাংলাদেশ ও চীনের মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য এটি একই সাথে চ্যালেঞ্জ এবং ‘লিপফ্রগ ডেভেলপমেন্ট’ বা দ্রুত উন্নতির সুযোগ নিয়ে এসেছে।
সেমিনারে বাংলাদেশ ও চীনের ৫ জন বিশেষজ্ঞ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা কেবল সড়ক বা সেতুতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা কি কেবল নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে দুই দেশের সেতু গড়ছি? না, আমাদের মূল সেতু হওয়া উচিত শিক্ষা।’ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে এই কৌশলগত সম্পর্কের অন্যতম অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মোসাদ্দেক খান বলেন, চীন যেহেতু বৃহৎ পরিসরে এআই সিস্টেম মোতায়েনে সফল, তাই চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করে তাদের কারিগরি ও হার্ডওয়্যার রিসোর্স ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, চীন ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব থাকলে এক বছরের মধ্যেই একটি সফল এবং কার্যকর সহযোগিতা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শরিফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার এখন ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় রয়েছে, যা উপাত্তা সংগ্রহের জন্য একটি বড় সম্পদ। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে দ্রুত ‘জাতীয় এআই নীতিমালা’ চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। এখন এই নীতিমালার খসড়া পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
ড. শরিফুল ইসলাম একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেন, এআই সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে সরকারের প্রায় ৪১ শতাংশ সেবা অপ্টিমাইজ বা আরও উন্নত করা সম্ভব। এটি কেবল সময় নয়, সরকারের ব্যয় কমাতেও বিশাল ভূমিকা রাখবে।
চীনের থোংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ কনটিনিউইং এডুকেশনের ডিন ড. চিন ফু’আন তুলে ধরেন কীভাবে চীন সরকার এবং থোংচি বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ মানুষের জন্য ‘লাইফলং লার্নিং’ বা আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছে।
এসআইআইএস-এর সহযোগী গবেষণা ফেলো ড. ফেং শুয়াই বলেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার এই জটিল সময়ে চীন ‘স্বাধীন উদ্ভাবন, উন্মুক্ততা এবং অংশীদারত্বমূলক প্রবৃদ্ধি’র পথ বেছে নিয়েছে, যা বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য একটি কার্যকর মডেল হতে পারে।
থোংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ড. চাও ছিনপেই এআই-এর কারিগরি উৎকর্ষ এবং এটি নিয়ন্ত্রণে চীনের সেরা অনুশীলনগুলো তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বের বড় টেক জায়ান্টরা বর্তমানে ডাটা মনোপলি বা তথ্যের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করছে, যা বৈশ্বিক এআই মানদণ্ডকে প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মতো দেশগুলোর জন্য পরামর্শ দেন।
মডারেটর ছেন ইলি বলেন, চীন ও বাংলাদেশ উভয়েই গ্লোবাল সাউথের সদস্য হিসেবে একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। চীনের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের সৃজনশীল তরুণ শক্তির সমন্বয়ে এআই সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। এই সেমিনার দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
সিএমজি






















