বিআরআই সহযোগিতা: বদলে যাওয়া নামিবিয়ার গল্প - Mati News
Sunday, July 12

বিআরআই সহযোগিতা: বদলে যাওয়া নামিবিয়ার গল্প

মাহমুদ হাশিম

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আমন্ত্রণে নামিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নেতুম্বো নান্দি নদাইতওয়া এক সপ্তাহের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে আসেন। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে নামিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর চীনে এটি তাঁর প্রথম সফর।

শুক্রবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে, সি এবং নান্দি যৌথভাবে ঘোষণা করেন যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে যৌথ ভবিষ্যতের চীন-নামিবিয়া কমিউনিটি’র পর্যায়ে উন্নীত করা হবে। তাঁরা অর্থনীতি ও বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং মানবসম্পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টিও প্রত্যক্ষ করেন।

প্রেসিডেন্ট নান্দি এই চীন সফরে অর্থনীতি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। আলোচনার সময় প্রেসিডেন্ট সি জোর দিয়ে বলেন যে, অবকাঠামো, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ আহরণ, কৃষি, শিক্ষা, যুব বিনিময় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নামিবিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীন প্রস্তুত।

প্রেসিডেন্ট সি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তিন দফা প্রস্তাবও পেশ করেন: শাসন সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান জোরদার করা, উচ্চ-মানের সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং যৌথভাবে আন্তর্জাতিক ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখা।

চায়না ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ‘উন্নয়নশীল দেশ বিষয়ক গবেষণা বিভাগ’-এর পরিচালক সু সিয়াওহুই উল্লেখ করেন যে, এই সফর উন্নয়নশীল দেশ এবং আফ্রিকায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী চীনা প্রতিষ্ঠান—উভয়ের জন্যই উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় অবস্থিত নামিবিয়ার ভূখণ্ড মূলত মরুভূমি-প্রধান এবং এর জনসংখ্যা ৩০ লাখের কিছু বেশি। ১৯৯০ সালে স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে এটি আফ্রিকার অন্যতম নবীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের সুবাদে নামিবিয়া একটি অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলেছে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যাপক উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করেছে।

চীন সফরে প্রেসিডেন্ট নান্দি দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনচেন পরিদর্শন করেন; শহরটি একসময়ের ছোট এক মৎস্যজীবী গ্রাম থেকে বর্তমানে বৈশ্বিক প্রযুক্তি-কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। নামিবিয়ারও নিজস্ব একটি ‘শেনচেন’ রয়েছে—আর তা হলো ওয়ালভিস বে।

ওয়ালভিস বে বন্দর এলাকাটিও একসময় ছোট এক মৎস্যজীবী গ্রাম ছিল, যেখানে মানুষ মূলত পারিবারিক পর্যায়ে মাছ ধরার ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০১৩ সাল থেকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-বিআরআইয়ের আওতায় এই অঞ্চলে চীনা উদ্যোগ ও উন্নয়নের ধারণাগুলো যুক্ত হয়। চীনা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পেশাগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এবং ভূ-তাত্ত্বিক জটিল চ্যালেঞ্জগুলো জয় করে বন্দরের অবকাঠামো উন্নত করেছে। বর্তমানে এই বন্দরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা আফ্রিকার শীর্ষস্থানীয় বন্দরগুলোর মতোই কন্টেইনার ও তেল পরিবহনের কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষম।

অবকাঠামোগত এই উন্নয়নের ফলে স্থানীয় সনাতন মৎস্যশিল্প বৃহৎ পরিসরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে। পাশাপাশি, চীনা বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি ও জ্ঞান হস্তান্তরের বিষয়টি উৎসাহিত করেছে, যার ফলে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা আধুনিক মৎস্যচাষ শিল্প গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

ওয়ালভিস বে বন্দরের উন্নয়নের এই কাহিনিটি স্থানীয় উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচেষ্টার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বের ওপর প্রেসিডেন্ট সি যে জোর দিয়েছেন, তার প্রতিফলন ঘটেছে চীনের সহযোগিতামূলক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবায়িত অসংখ্য সফল প্রকল্পে।

উদাহরণস্বরূপ, নামিবিয়ার খনি শিল্পের পানির চাহিদা মেটাতে সমুদ্রের পানিকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার স্থাপনা নির্মাণে চীন সহায়তা করেছে। চীনা প্রকল্পগুলো কেবল স্থানীয় কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেনি, বরং দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষদের আত্ম-উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠাতেও সহায়তা করেছে। এ ছাড়া, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা ‘ক্লিন এনার্জি’র ক্ষেত্রে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা নামিবিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি পূরণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে যাচ্ছে।

সু সিয়াওহুই উল্লেখ করেন যে, চীন-নামিবিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই উত্তরণ ইঙ্গিত দেয় যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর জন্য আরও বেশি সুযোগ এবং জোরালো কণ্ঠস্বর তৈরি হয়েছে।

সিএমজি বাংলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *