রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিতেই চীনে সবুজ শক্তি বিপ্লব - Mati News
Thursday, May 7

রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিতেই চীনে সবুজ শক্তি বিপ্লব

ফয়সল আবদুল্লাহ

২০০৬ সালে চীনে যখন নবায়নযোগ্য শক্তি আইন কার্যকর হয়, তখন দেশটির পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তি খাত ছিল বেশ ক্ষুদ্র। তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির বিরুদ্ধে দেশটি যখন লড়াই করছিল, তখন এ খাতও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে দুই দশক পরের রূপান্তরটা এক কথায় বিস্ময়কর। ২০২৫ সালের মধ্যে, চীনে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মোট ব্যবহারকেও ছাড়িয়ে গেছে। চীনের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৬০ শতাংশেরও বেশি এখন আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।

নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিশ্বনেতার আসনে আসার এই অভাবনীয় উত্থান চীনের জন্য কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি দূরদর্শী আইন ও প্রশাসনের পরিকল্পনাতেই সম্ভব হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৬ সালের আইনটি একটি শক্তি সংকটকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রচনা করেছিল।

চীনের জ্বালানি গবেষণা সোসাইটির নির্বাহী ভাইস-চেয়ারম্যান চৌ তাতি ব্যাখ্যা করেছেন, চীনে তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার প্রেক্ষাপটেই আইনটি প্রণীত হয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে চীনের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পর অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না বিদ্যুৎ সরবরাহ। এর ফলে পর্যায়ক্রমিক লোডশেডিং একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।

চৌ আরও বলেন, যদিও ওই সময়ে উন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল এবং চীনের নির্গমন তুলনামূলক অনেক কম ছিল, তবুও দেশটির বিশাল জনসংখ্যার কারণে এর মোট শক্তি ব্যবহারটা উপেক্ষা করা যাচ্ছিল না।

নবায়নযোগ্য শক্তি আইনের প্রণয়ন তখন নির্ণায়ক সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এটি নবায়নযোগ্য শক্তিকে একটি অগ্রাধিকার বিভাগে পরিণত করেছে। নীতিগত অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং এই শিল্প চালুর আইনি নিশ্চয়তাও দিয়েছে।

২০০৩ সালে, চীনের সর্বোচ্চ আইনসভা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস, নবায়নযোগ্য শক্তি সংক্রান্ত আইনকে তাদের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

আইনটির খসড়া প্রণয়নে একজন প্রধান অংশগ্রহণকারী ওয়াং চোংইং ২০০৪ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে স্মরণ করেন। ওই বছর, জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সম্মেলন’-এ চীন বিশ্বকে ঘোষণা করে যে তারা আইনটি কার্যকর করবে। ওয়াং আইনটি প্রণয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেন।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সাথে নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা প্রকল্প, সেইসাথে বিভিন্ন বিভাগ কর্তৃক জার্মানি ও ডেনমার্কে আয়োজিত দলগত অধ্যয়ন সফরের মাধ্যমে আমরা নবায়নযোগ্য শক্তি সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া গভীর করেছি এবং আইনটির খসড়া প্রণয়নের কাজকে ত্বরান্বিত করেছি।’

ওয়াং এবং তার দলের প্রচেষ্টার ফলে ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রেণিবদ্ধ মূল্য নির্ধারণ, নিশ্চিত ক্রয় এবং বিশেষ তহবিল সম্বলিত আইনটি গৃহীত হয়।

গ্লোবাল উইন্ড এনার্জি কাউন্সিলের এশিয়ার সাবেক প্রধান ছিয়াও লিমিং বলেন, যদিও আইনটি প্রাথমিকভাবে কাঠামো এবং নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিল, কিন্তু পরে প্রণীত ধারাবাহিক বাস্তবায়ন বিধিগুলোই বাজারকে প্রকৃত অর্থে চালিত করেছে।

তিনি জার্মান মডেল থেকে ধার করা স্থির ফিড-ইন ট্যারিফ নীতিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে স্থিতিশীলভাবে গ্রিডের সাথে সংযুক্ত হতে এবং বিক্রি করার পথ সুগম করেছে। সক্ষম করেছে, যার ফলে বাজারের দরজা খুলে গেছে।’

চীনের ফিড-ইন ট্যারিফ ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং সম্পদ অঞ্চলের জন্য শ্রেণিবদ্ধ মূল্যস্তর রয়েছে। এতে গ্রিড অপারেটররা সরকার-নির্ধারিত মূল্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কিনতে হয়।

বায়ুশক্তির জন্য ভর্তুকিতে ছয়বার এবং সৌরশক্তির জন্য আটবার সমন্বয়ের পর, চীনে নতুন অনুমোদিত স্থলভাগের বায়ু ও সৌর প্রকল্পগুলো গ্রিড সমতা অর্জন করেছে।

আইনটি প্রণয়নের পরের প্রথম দশকে, চীনের বায়ুশক্তির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০ গুণ বেড়ে ১২ লাখ ৬০ হাজার কিলোওয়াট থেকে ১৫ কোটি কিলোওয়াটে পৌঁছেছে, এবং একই সময়ে সোলার মডিউলের দাম তার মূল খরচের মাত্র এক-দশমাংশে নেমে এসেছে।

তবে, এই শিল্পের প্রসারের সাথে সাথে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও সামনে আসে। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যেই, হ্রাসকৃত বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের পরিমাণ ২০১৫ সালের পুরো বছরের মোট পরিমাণকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর মোকাবিলায়, কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সালে সম্পূর্ণ-নিশ্চিত ক্রয় ব্যবস্থার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য পোর্টফোলিও মান চালু করে, যা প্রতিটি প্রদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের জন্য বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়।

সূত্র: সিএমজি

https://www.chinadailyhk.com/upload/main/image/2026/05/07/76dcbcb55b3b9688e97d55ea80a2445e.jpg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *