ডেলিভারি রাইডারের হাতে চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান - Mati News
Tuesday, July 21

ডেলিভারি রাইডারের হাতে চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান

আফরিন মিম

খাবার ডেলিভারির ফাঁকে কবিতা লিখে চীনের শীর্ষ সাহিত্য পুরস্কার জয়

সময় যেন সব সময় তার প্রতিপক্ষ। হাতে খাবারের প্যাকেট, চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে, কানে নতুন অর্ডারের শব্দ। শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলাই তার প্রতিদিনের জীবন। কিন্তু এই নিরন্তর দৌড়ের মাঝেই তিনি খুঁজে পান কবিতার শব্দ। আর সেই শব্দই তাকে পৌঁছে দিয়েছে চীনের অন্যতম সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ল্যু সুন সাহিত্য পুরস্কারে

৫৬ বছর বয়সী ওয়াং চিপিং পেশায় একজন খাবার সরবরাহকারী। চীনের কোটি কোটি ডেলিভারি রাইডারের মতো তিনিও প্রতিদিন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে বেড়ান। তবে অপেক্ষার ছোট ছোট মুহূর্ত—রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরি হওয়া, লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা গ্রাহকের দরজায় অপেক্ষা এসবই তার কাছে হয়ে ওঠে কবিতা লেখার সময়।

সম্প্রতি তার কাব্যগ্রন্থ ‘লো ফ্লাইট’ চীনের নবম ল্যু সুন সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছে। বইটিতে উঠে এসেছে ডেলিভারি রাইডারদের সংগ্রাম, ক্লান্তি, স্বপ্ন, অপমান, ভালোবাসা এবং জীবনের গভীর অনুভূতির গল্প।

পুরস্কার জয়ের পর সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, বিশেষ এই দিনে তিনি কী করতে চান? উত্তরে ওয়াং বলেছেন, আমি আবার স্কুটারে উঠতে চাই। ডেলিভারি করতে চাই। মাটির কাছাকাছি থাকলেই লেখার জন্য সবচেয়ে পরিষ্কার মনটা খুঁজে পাই।”

১৯৬৯ সালে চীনের চিয়াংসু প্রদেশে জন্ম ওয়াংয়ের। মাধ্যমিকের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। এরপর কখনও নির্মাণ শ্রমিক, কখনও নদী থেকে বালু তোলার শ্রমিক, কখনও ফেরিওয়ালা, আবার কখনও পুরোনো জিনিস সংগ্রহের কাজ করেছেন।

তবে দারিদ্র্য তার পড়ার নেশা কেড়ে নিতে পারেনি। পুরোনো বইয়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন, বাতিল সংবাদপত্র কুড়িয়ে পড়েছেন। বইয়ের প্রতি সেই ভালোবাসাই একদিন তাঁকে কবিতার জগতে নিয়ে আসে। ২০১৯ সালে, ৫০ বছর বয়সে তিনি খাবার সরবরাহের কাজ শুরু করেন। তখন তিনি ছিলেন নিজের ডেলিভারি স্টেশনের সবচেয়ে বয়স্ক রাইডার।

ডেলিভারি অ্যাপের কাউন্টডাউন যেন তার প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার পৌঁছে না দিতে পারলে জরিমানা, অভিযোগ কিংবা আয়ের ক্ষতি সবই অপেক্ষা করে।

একদিন এক গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ায় তাকে কয়েকবার ঘুরতে হয়। ফেরার পথে লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বিরক্তি আর ক্লান্তির ভেতর হঠাৎ কিছু পঙ্‌ক্তি মাথায় আসে। সেই কবিতার নাম ‘ম্যান ইন আ হারি’

২০২২ সালে কবিতাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই ওয়াং চিপিংয়ের নাম পরিচিত হয়ে ওঠে সাহিত্যজগতে।

এবারের ল্যু সুন সাহিত্য পুরস্কারে শুধু ওয়াং নন, একজন বাজারের দোকানদারের প্রবন্ধ সংকলন এবং একজন অনলাইন লেখকের ছোটগল্পও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে।

ওয়াং নিজেও মনে করেন, সাধারণ মানুষের লেখা বেশি আন্তরিক, কারণ তা সরাসরি বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসে।

ওয়াংয়ের কবিতায় বড় কোনো নায়ক নেই। আছে বৃষ্টির মধ্যে খাবারের বাক্স আগলে রাখা একজন ডেলিভারি রাইডার, আছে বৃষ্টিতে এগিয়ে চলা একটি পিঁপড়ে।

তিনি লেখেন, ‘একটি পিঁপড়েও নিশ্চয়ই কোনো দায়িত্ব বা বেদনা বুকে নিয়ে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে হাঁটে; ঠিক যেমন ভেজা রাস্তায় নিজের পিঠের খাবারের বাক্সটি বাঁচিয়ে ছুটে চলে একজন ডেলিভারি রাইডার’।

পুরস্কারজয়ী কাব্যগ্রন্থের নাম ‘লো ফ্লাইট’—অর্থাৎ নিচুতে উড়ান। এই নামেই যেন লুকিয়ে আছে তার জীবনের দর্শন।

তিনি লিখেছেন—

‘নিচুতে উড়াও এক ধরনের উড়ান।
মাটির কাছ থেকে যে শব্দ ওঠে,
সেটাই ওপরে ওঠার চেষ্টা করা সব জীবনের সিম্ফনি’।

ওয়াং বলেন, তিনি কখনো পূর্ণকালীন লেখক হতে চান না। কারণ তার সমস্ত অনুপ্রেরণা আসে ডেলিভারির কাজ থেকেই। তার কাছে প্রতিটি অর্ডার শুধু খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নয়, বরং নতুন একটি কবিতার সম্ভাবনা।

জীবনের শেষ কথা যেন তিনি নিজেই লিখে দিয়েছেন তার কবিতায়—

‘জীবন আমার ওপর যত তুষারই ফেলুক না কেন, আমি ঠিক ততগুলো বসন্তের সঙ্গেই দেখা করব’।

সূত্র: সিএমজি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *