মেড ইন চায়না: চীনের মেরু স্টেশন - Mati News
Saturday, January 24

মেড ইন চায়না: চীনের মেরু স্টেশন

পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ, দুই প্রান্তেই আজ চীনের শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক উপস্থিতি রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা শীতল অঞ্চল থেকে আর্কটিকের দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত, চীন তার বৈজ্ঞানিক গবেষণার নেটওয়ার্ক প্রসারিত করেছে। এই কেন্দ্রগুলো শুধু দেশীয় গবেষণার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু, মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান, পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ এবং বরফস্তর ও সমুদ্র-বরফের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের ছয়টি মেরু স্টেশনের প্রতিটির রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এদের গবেষণার লক্ষ্য প্রসারিত করে চলেছে মানবজাতির জ্ঞানের পরিসীমা।

প্রথমেই আসা যাক অ্যান্টার্কটিক গ্রেট ওয়াল স্টেশনের প্রসঙ্গে। ১৯৮৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চীনের প্রথম স্থায়ী অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কেন্দ্র গ্রেট ওয়াল স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কিং জর্জ আইল্যান্ডের ফিল্ডেস পেনিনসুলায় অবস্থিত, যেখানে তুষারপাত ও বরফের সঙ্গে মানুষের টেকসই জীবনযাপন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতে তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় মাইনাস ২৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

গ্রেট ওয়াল স্টেশনের প্রধান কাজ হলো জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত গবেষণা, আবহাওয়া ও বরফ পর্যবেক্ষণ, ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, ভূ-চৌম্বকত্ব এবং স্যাটেলাইট ম্যাপিং। এখানে গ্রীষ্মকালে চল্লিশ জন এবং শীতের সময় পঁচিশ জন গবেষক একসঙ্গে অবস্থান করতে পারেন।  ২০০৬ সালে এটি চীনের জাতীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং অ্যান্টার্কটিক গ্রেট ওয়াল ন্যাশনাল কি ফিল্ড অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশন অব পোলার ইকোসিস্টেম নামে পরিচিতি লাভ করে।

গ্রেট ওয়াল স্টেশন চীনের অ্যান্টার্কটিক অভিযানকে একটি স্থায়ী ভিত্তি দিয়েছে। এটি অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্রের জন্য লজিস্টিক সমর্থন সরবরাহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

১৯৮৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চীনের দ্বিতীয় স্থায়ী অ্যান্টার্কটিক কেন্দ্র চোংশান স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার লারসেম্যান হিলস এলাকায় অবস্থিত। চোংশান স্টেশন প্রধানত আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিজ্ঞান, বরফ ও তুষার, সমুদ্র, ভূতত্ত্ব, ভূ-রসায়ন, এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

এখানে গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং শীতে তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় মাইনাস ৪৫.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। গ্রীষ্মে এখানে থাকতে পারেন ১২০ জন এবং শীতে পঁচিশ জন গবেষক।

২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি চীন তার প্রথম অভ্যন্তরীণ অ্যান্টার্কটিক গ্রীষ্মকালীন স্টেশন খুনলুন স্থাপন করে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,০৮৭ মিটার উচ্চতায়। এখানে গ্রীষ্মকালেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতে তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় মাইনাস ৮৩.১ ডিগ্রিতে। বলা যায়, পৃথিবীর চরমতম আবহাওয়াগুলোর মধ্যে এটি একটি।

খুনলুন স্টেশনের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হলো বরফখণ্ড সংক্রান্ত যাবতীয় বিজ্ঞান। এর বাইরে মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান, ভূ-চৌম্বকত্ব এবং বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান নিয়েও চলে গবেষণা। এখানে একসঙ্গে ২০ জন গবেষক কাজ করতে পারেন। অ্যান্টার্কটিকার অভ্যন্তরীণ বরফস্তরের তথ্য সংগ্রহ ও সমীক্ষার জন্য চীনের গবেষণাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে খুনলুন স্টেশন।

২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় থাইশান ক্যাম্প। এটি খুনলুন স্টেশন ও চোংশান স্টেশনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মকালীন সাপোর্ট স্টেশন হিসেবে কাজ করে। খুনলুন থেকে ৭১৫ ও চোংশান স্টেশন থেকে ৫২০ কিলোমিটার দূরে এটি। প্রধানত বরফস্তর পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় ব্যবহৃত হয়।

মেরু হিমবাহ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং মহাকাশ পদার্থবিদ্যা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও রয়েছে থাইশান ক্যাম্পে। থাইশান ক্যাম্পে প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময় ২০ জন গবেষক থাকতে পারেন। এখানে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতে সর্বনিম্ন মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আর্কটিকে চীনের একমাত্র গবেষণা স্টেশনটি হলো ইয়েলো রিভার স্টেশন। ২০০৪ সালের স্পিটসবার্গেন দ্বীপপুঞ্জে এটি গড়ে তোলা হয়। এখানে গ্রীষ্মের সময় মোটামুটি তেমন শীত না থাকলেও শীতের সময় তাপমাত্রা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রিরও নিচে নেমে আসে। স্টেশনটি আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্র ও স্থলজ জীববৈচিত্র্য, মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান, বরফস্তরের গতিবিধি, বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিজ্ঞান ও ভূ-তথ্য পর্যবেক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ২০২১ সালে এটি আর্কটিক ইয়েলো রিভার আর্থ সিস্টেম ন্যাশনাল অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার হিসেবে জাতীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের স্বীকৃতি পায়।

এবার আসা যাক চীনের বর্তমান ও সবচেয়ে আধুনিক ব্যবস্থা সম্পন্ন অ্যান্টার্কটিক ছিনলিং স্টেশনের প্রসঙ্গে। চীনের সর্বশেষ অ্যান্টার্কটিক স্টেশন এটি। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টার্কটিকার টেরা নভা বে অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করে এটি। আধুনিক স্টেশনটি ৫,২৪৪ বর্গমিটার এলাকায় বিস্তৃত।

ছিনলিং স্টেশন নির্মাণের সময় চীন প্রথমবারের মতো বায়ু–সৌর–হাইড্রোজেন–সংরক্ষণ সমন্বিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এই ব্যবস্থার ফলে বছরে একশ টনেরও বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়েছে। এমনকি মেরু অঞ্চলের দীর্ঘ অন্ধকার সময়, যখন বাতাসও থাকে না, সূর্যালোকও অনুপস্থিত—সেই পরিস্থিতিতেও স্টেশনটি প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষিত সবুজ জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম শতভাগ পরিষ্কার জ্বালানির মাধ্যমে সচল রাখা সম্ভব হয়, যা অ্যান্টার্কটিক গবেষণায় টেকসই শক্তি ব্যবহারের এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।

একই সঙ্গে ছিনলিং স্টেশনে স্থাপন ও উন্নত করা হচ্ছে একটি স্মার্ট লজিস্টিক্স ওয়্যারহাউস এবং বুদ্ধিমান নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এই আধুনিক গুদামব্যবস্থায় মেরু অঞ্চলের উপযোগী রোবটের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে মানবহীন ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে। চরম পরিবেশে প্রযুক্তিনির্ভর এই লজিস্টিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিনলিং স্টেশনকে শুধু একটি গবেষণা কেন্দ্র নয়, বরং অ্যান্টার্কটিকায় ভবিষ্যৎ স্মার্ট ও টেকসই স্টেশন নির্মাণের একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

চীনের তৈরি প্রযুক্তিতে এই ছিনলিং স্টেশনে সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে প্রতিদিন পাওয়া যাচ্ছে ২০ টন পানযোগ্য পানি।

গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো বরফ-পৃষ্ঠ ও সমুদ্র সম্পর্ক, পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান পর্যবেক্ষণ, মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান এবং ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন।

চীনের এই ছয়টি মেরু গবেষণা কেন্দ্র কেবল বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের স্থান নয়, বরং মানবজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অভিযাত্রার প্রতীক। গ্রেট ওয়াল থেকে খুনলুন, থাইশান ও ছিনলিং স্টেশন এবং আর্কটিকের ইয়েলো রিভার স্টেশন—সবগুলো মিলিয়ে চীন পৃথিবীর চরম অঞ্চলে গবেষণা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও মহাকাশ-বিষয়ক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। এগুলো প্রমাণ করে, চীনের মেরু অভিযাত্রা শুধুমাত্র দেশীয় মর্যাদা নয়, বরং বৈশ্বিক জ্ঞান বৃদ্ধিতে এক অবিস্মরণীয় অবদান।

সূত্র: সিএমজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *