ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা
থাং রাজবংশের সময় জেনকুয়ান স্বর্ণযুগের সূচনার সঙ্গে সম্রাট থাইজুংয়ের ‘ছুনশু জিইয়াও (সকল শাস্ত্রের সংকলন)’-এর প্রয়োগের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। থাইজুং ছিলেন আদর্শবান। গুরুত্ব দিতেন নৈতিক শিক্ষায়। একটি যুক্তি, ন্যায়সংগত ও আইনসম্মত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। জেনকুয়ান জেংইয়াও (জেনকুয়ান যুগের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়)-তে সম্রাট থাইজুং ও তার মন্ত্রীদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল সেসব লিপিবদ্ধ রয়েছে। এতে জানা যায়, নিজের উপদেশগুলোকে রাজ্যশাসনেও প্রয়োগ করেছিলেন সম্রাট থাইজুং।

জেনকুয়ান জেংইয়াও-এর ‘অধ্যায়: লোভ ও হীনতা সম্পর্কে’-তে উল্লেখ আছে, জেনকুয়ান সালের প্রথম বছর (৬২৭ খ্রিস্টাব্দে), সম্রাট থাইজুং তার সভাসদদের বলেছিলেন—‘ধরা যাক কারও কাছে অমূল্য একটি মুক্তা আছে। তিনি যদি সেটাকে পাখি শিকারের কাজে লাগাতে চান, তবে কি তা বোকামি হবে না? মানুষের জীবন মুক্তার চেয়ে মূল্যবান, কিন্তু কেউ যদি আইন ও শাস্তির তোয়াক্কা না করে সোনা-রূপা বা অর্থ দেখে অবৈধ উপায়ে তা বাগিয়ে নিতে চায়, তবে ধরে নেওয়া যায়, তিনি তার জীবনকেই মূল্য দেননি। মুক্তা বাহ্যিক বস্তু। তা দিয়ে পাখি শিকার করা অনুচিত। তো, মুক্তার চেয়েও মূল্যবান জীবনকে কেউ কীভাবে অর্থের বিনিময়ে বিকিয়ে দেয়? মন্ত্রীরা যদি তাদের কর্তব্যে বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করেন, তবে তারা উচ্চ পদমর্যাদা ও সম্মান পাবেন। ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের প্রয়োজন নেই।’
সম্রাট থাইজুং ‘মুক্তা দিয়ে পাখি শিকারের’ রূপক উদাহরণ দিয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন যে তাদের নিজেদের পদ ও সম্মান রক্ষা করা উচিত।
জেনুকয়ান সালের দ্বিতীয় বছর সম্রাট থাইজুং সভাসদদের বলেছিলেন, ‘লোভী ব্যক্তি অর্থের প্রকৃত মূল্য বোঝে না। পঞ্চম বা এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যথেষ্ট বেতন-ভাতা পান। তারা ঘুষ নিতে চাইলেও তা কয়েক হাজার মুদ্রার চেয়ে বেশি হবে না। কিন্তু একবার এ কুকর্ম প্রকাশ পেলে তারা পদচ্যুত হবেন, বেতনও হারাবেন। তারা কি অর্থের মূল্য বুঝতে পেরেছেন? তারা মূলত অল্প লাভের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনছেন, যা মোটেও লাভজনক নয়।’
এই নীতি বোঝাতে সম্রাট থাইজুং একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছিলেন—লু রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কুং ইশিউ অত্যন্ত সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। অধীনস্থদের প্রতি ছিলেন কঠোর। কখনও সাধারণ মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন না। তিনি মাছ খেতে খুব পছন্দ করতেন। একদিন এক অধীনস্থ কর্মকর্তা বিষয়টি জেনে তাকে অনেকগুলো মাছ উপহার দিতে এসেছিলেন। কিন্তু কং ইশিউ তা গ্রহণ করেননি। মাছগুলো ফেরত পাঠান। উপহারদাতা জানতে চাইলেন, ‘আমি জানি আপনি মাছ পছন্দ করেন, তাই ভালো দেখে কিছু এনেছিলাম। এখন নিতে চাচ্ছেন না কেন?’ উত্তরে কং ইশিউ বললেন, ‘আমি মাছ পছন্দ করি বলেই আপনার মাছ নিতে পারছি না। আজ আপনার মাছ গ্রহণ করলে, অচিরেই ঘুষের দায়ে কারাবন্দি হবো। আমি কারাগারে গেলে তখন কোথায় মাছ পাব?’ কং ইশিউ ছিলেন বিচক্ষণ। ক্ষণিকের লাভের আশায় বিচারশক্তি হারাননি।
‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে শাসন— শিক্ষাই সর্বাগ্রে’ এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন সম্রাট থাইজুং। বারবার কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের সতর্ক করতেন, তারাও যাতে এ থেকে শিক্ষা নেন।
জেনকুয়ান সালের চতুর্থ বছরে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দে) সম্রাট থাইজুং তার মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ‘আমি সারা দিন এক মুহূর্তের জন্যও অলস থাকি না। আমি শুধু জনগণের প্রতি উদ্বিগ্ন ও স্নেহশীল নই, বরং এও চাই যে তারা যাতে দীর্ঘকাল সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল থাকতে পারে। আকাশ যেমন উচ্চ, পৃথিবী যেমন গভীর, আমিও ততটা শ্রদ্ধার সাথে আকাশ-পৃথিবীকে ভয় করি। যদি তোমরাও সাবধানে আইন মেনে চলো এবং সবসময় ভয়-শ্রদ্ধা নিয়ে থাকো, তাহলে শুধু প্রজারা সুখী হবে না, তোমরাও চিরদিন আনন্দ পাবে।’
প্রাচীন একটি বাণী স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ‘সৎলোকের অধিক সম্পদ তার সংকল্পকে দুর্বল করে, আর মূর্খের অধিক সম্পদ পাপ বাড়ায়।’ অর্থাৎ, সৎ ব্যক্তিরও যদি সম্পদ বেশি হয়, তবে সে বিলাসী ও অহংকারী হয়ে উঠতে পারে, অমার্জিত হতে পারে এবং তার সংকল্প দুর্বল হতে পারে। আবার যে ব্যক্তি বুদ্ধিহীন, তার প্রচুর অর্থবিত্ত হলে সে বিপথে যেতে পারে।
তাই বলা হয়, ‘প্রাচীনকালে অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সাধারণ পরিবার থেকে এসেছেন’ এবং অনেক সফল ব্যক্তি যুবক বয়সে দরিদ্র জীবনযাপন করেছেন, যাতে তারা পবিত্র সংকল্প ধরে রাখতে পারেন এবং ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করতে পারেন।
জেনকুয়ান শাসনামলের ষোলতম বছরে (৬৪২ খ্রিস্টাব্দে), সম্রাট থাইজুং সভাসদদের বলেছিলেন, ‘প্রাচীনরা বলেছেন, পাখিরা জঙ্গলে বাসা বাঁধে, তবু তারা গাছ যথেষ্ট উঁচু নয় বলে শঙ্কিত হয়, তাই তারা গাছের শীর্ষে বাসা বানায়। মাছেরা জলে বাস করে, তবু তারা জল যথেষ্ট গভীর নয় বলে শঙ্কিত হয়, তাই তারা জলাশয়ের গভীর গর্তে আশ্রয় নেয়। কিন্তু তবুও তারা মানুষের হাতে ধরা পড়ে—কেন? লোভের কারণে। টোপের প্রতি মোহটাকে বাদ দিতে না পারার কারণে। এখন তোমরা মন্ত্রী হিসেবে উচ্চ পদ ও বিপুল বেতন পাচ্ছো। তোমাদের উচিত বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ ও নির্লোভ হওয়া। তবেই দীর্ঘকাল সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল থাকতে পারবে।’
থাইজুংয়ের ভাষ্যে, ‘প্রাচীনরা বলেছেন, কল্যাণ ও অকল্যাণের কোনো নির্দিষ্ট দরজা নেই। মানুষ নিজেই এসব নিজের কাছে নিয়ে আসে। যারা আইন ভেঙে নিজেদের বিপদ ডেকে আনে, তারা অর্থের লোভে করে। তারা ওই পাখি ও মাছের থেকে আলাদা নয়। তোমাদের উচিত কথাগুলো ভালোভাবে চিন্তা করা এবং সতর্কবাণী হিসেবে গ্রহণ করা।
প্রাচীনরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অর্থ, কাম, খ্যাতি ও বস্তুগত লোভের সম্মুখীন হলে আমাদের সতর্ক, ভীত ও সাবধান হওয়া উচিত। তখন মনে করতে হবে আমরা গিরিখাতের ধারে দাঁড়িয়ে অথবা পাতলা বরফের ওপর হাঁটছি। কেউ অর্থ বা সৌন্দর্যের মাধ্যমে আমাদের প্রলুব্ধ করতে চাইলেও আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। বাস্তবে, তা কেবল একটি টোপ যা আমাদেরকে মূলত চূড়া থেকে লাফ দেওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে। যদি আমরা নিজেদের সংযত রাখতে না পারি এবং প্রলোভন প্রতিরোধে ব্যর্থ হই, তবে আমরা সেই গভীর খাদে পড়ব। যেখানে একবার পড়লে আক্ষেপ থাকবে অনন্তকাল।
প্রাচীনরা এও বলেছেন, পড়াশোনা করো, জ্ঞান অর্জন করো। এতে মন শান্ত হয়। সংগীত, আচার-অনুষ্ঠান ও নৈতিক শিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে।
সম্রাট থাইজুং সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী সম্রাট হতে পেরেছিলেন। এর বেশিরভাগ কৃতিত্ব ‘ছুনশু জিইয়াও’-কে দেওয়া যায়। গ্রন্থটি প্রাচীন ঋষি-সম্রাটদের রাজ্যশাসনের আদর্শ, পদ্ধতি, অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের একটি সংকলন। এটি পাঠ করে তিনি সামাজিক নৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি বুঝতে পেরেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন— দেশ শাসনের সূচনা করতে হয় শাসকের নিজের চরিত্র গঠনের মাধ্যমে। তাই তিনি ওয়েই জেংয়ের পরামর্শ মেনে চলে নৈতিকতা, সদাচার ও ঋষিদের শিক্ষার প্রচার শুরু করেন এবং অত্যন্ত অল্প সময়েই দেশে শান্তি-সমৃদ্ধি ও অন্য রাষ্ট্রগুলোর শ্রদ্ধা অর্জন করেন। আর এভাবেই প্রতিষ্ঠা হয় জেনকুয়ান স্বর্ণযুগ।
লেখক: সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা, বেইজিং
সূত্র: সিএমজি



















