“মাত্র তিন লাখ টাকায় পাঁচ তারকা হোটেলের মালিক হয়ে যান!”
বিজ্ঞাপনটা দেখে প্রথমে চোখ কপালে উঠলেও পরক্ষণেই মনে হলো—এ তো দারুণ সুযোগ!
বলা হচ্ছে, ৮০ কক্ষের সুবিশাল একটি হোটেল তৈরি হবে। থাকবে সুইমিংপুল, লাক্সারি জিম, দামি রেস্টুরেন্ট, নজরকাড়া আর্কিটেকচার—সব মিলিয়ে একেবারে রাজকীয় আয়োজন।
তার ওপর মার্কেটিংও চমৎকার। অফিসে ঢুকতেই এমন আপ্যায়ন, মনে হবে এক দিনের জন্য হলেও রাজা বনে গেছি।
কিন্তু বিনিয়োগ করার আগে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল—আমি আসলে কী পাব?
সুন্দরী এক প্রতিনিধি হাসিমুখে বললেন,
“স্যার, আপনি প্রতি বছর তিন রাত ফ্রিতে থাকতে পারবেন। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। আর আজই বুকিং করলে উপহার হিসেবে স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্য বিশেষ হানিমুন ট্যুর!”
পাশে বসা স্ত্রীর চোখ চকচক করে উঠল।
বিয়ের এত বছর হয়ে গেল, বিশেষ ট্যুর তো আর দেওয়া হয়নি!
আমার নিজেরও মনে হলো—পকেটে যা টাকা আছে সব বের করে দিয়ে আসি। হোটেলের মালিক হব, স্ত্রীকে ট্যুরে নিয়ে যাব—জীবন তো একটাই!
কিন্তু হঠাৎ থেমে গেলাম।
আমার কাছেই তো তিন লাখ টাকা নেই!
মনের দুঃখের কথা প্রতিনিধিকে বলতেই তিনি মিষ্টি হেসে বললেন,
“কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। কিস্তিতেও দিতে পারবেন। এখন শুধু ১০ হাজার টাকা দিয়ে সাইন করলেই হবে। আর ভাবীকে নিয়ে কবে ট্যুরে যেতে চান, সেটা আমাকে জানাবেন।”
বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল।
আহা! কিস্তিতে হোটেলের মালিকানা, সঙ্গে ফ্রি ট্যুর!
এবার আর ঠেকায় কে?
জীবনে টাকা আসবে, টাকা যাবে। এত হিসাব করে লাভ কী? স্ত্রী খুশি হবে, আমিও হোটেলের মালিক হব!
তার ওপর আশপাশের সবাই কিনছে।
কিন্তু আবারও একটা প্রশ্ন মাথায় এলো।
স্ত্রীর বিরক্ত চোখ উপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করলাম,
“মোট কতগুলো শেয়ার ছাড়ছেন?”
প্রতিনিধি হাসলেন।
“মাত্র পাঁচ হাজারটি শেয়ার, স্যার। প্রতি শেয়ারের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির মালিকানা পাবেন। আমরা সাফ-কাবলা করে দেব। আজীবন মালিকানা থাকবে। এমনকি সন্তানদেরও উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যেতে পারবেন।”
শুনে মনে হলো—এ তো অপ্রতিরোধ্য অফার!
সাইন করব কি না ভাবছি। আমার ধীরগতিতে স্ত্রী এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন জীবনে এত বোকা মানুষ সে আর দেখেনি।
কিন্তু আমি তখন অন্য হিসাব করছি।
৮০টি কক্ষ, মালিক ৫ হাজার জন।
একটি কক্ষের ভাগে পড়ল প্রায় ৬২ জন মালিক।
প্রত্যেকে যদি বছরে তিন রাত করে থাকেন, তাহলে একটি কক্ষের মালিকদের থাকার চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৮৬ রাত!
তাহলে হোটেলের সাধারণ অতিথিরা থাকবে কখন?
আচ্ছা, ধরলাম মালিকরা সবাই একই সময়ে থাকবেন না।
কেউ ছুটিতে গেলেন, কেউ সপ্তাহের মাঝখানে গেলেন।
কিন্তু একজন সাধারণ অতিথি যদি টানা দুই রাত থাকতে চান, তিনি কি রুম পাবেন?
আর সপ্তাহের মাঝখানে ফাইভ-স্টার হোটেলে অতিথি কম থাকলে সেই হোটেলের আয়ই বা হবে কীভাবে?
তারপরও ভাবলাম—গেস্ট থাকুক আর না থাকুক, আমি তো বছরে তিন রাত ফ্রিতে থাকছি। মন্দ কী!
প্রায় সাইন করেই ফেলেছি।
আবার একটা প্রশ্ন মাথায় এলো।
আমরা যে মালিকরা থাকব, হোটেলের খরচ কে দেবে?
বিদ্যুৎ-পানি?
স্টাফদের বেতন?
সিকিউরিটি?
সুইমিংপুলের রক্ষণাবেক্ষণ?
জিম?
বাগানের পরিচর্যা?
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা?
বেডশিট ধোয়া ও পরিবর্তন?
রক্ষণাবেক্ষণ?
খাবার?
প্রতিনিধি এবারও হাসিমুখে বললেন,
“মালিক যেহেতু আপনারাই, তাই এসব খরচও আপনারাই বহন করবেন।”
আমি এবার সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেলাম।
যে হোটেলে পাঁচ হাজার মালিকের মধ্যে প্রত্যেকে বছরে মাত্র তিন রাত করে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন, অথচ হোটেলের পরিচালন ব্যয়ও তাদেরই বহন করতে হবে—সেখানে লাভটা আসবে কোথা থেকে?
তখন মনে হলো, এটা হোটেল নয়।
এটা তো টাকা পোড়ানোর মেশিন!
আর তিন-চার বছর পর ফার্নিচার বদলাতে হবে। লাইট নষ্ট হবে। এসি মেরামত করতে হবে। দেয়ালে রং করতে হবে। ছাদে সমস্যা হবে। বাথরুম সংস্কার করতে হবে।
তখন আবার মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা উঠবে।
লাখ লাখ টাকা!
এবার প্রতিনিধিকে আরেকটা প্রশ্ন করলাম,
“আচ্ছা, আমরা পাঁচ হাজার জন যদি মোট ১৫০ কোটি টাকা দিয়ে হোটেল বানাই, আপনাদের লাভটা কোথায়?”
তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হিসাবটা বুঝিয়ে দিলেন।
“আমাদের গ্রুপ এখান থেকে ৫০ কোটি টাকা প্রফিট রাখবে। বাকি ১০০ কোটির মধ্যে ১০ কোটি অনলাইন বুস্টিং, বিজ্ঞাপন ও আমাদের সেলসম্যানদের পুরস্কারের জন্য। যে যত বেশি বিক্রি করতে পারবে, সে তত বেশি পাবে।”
অর্থাৎ, যত বেশি মানুষকে শেয়ার বিক্রি করা যাবে, তত বেশি কমিশন!
তিনি আবার বললেন,
“সব মিলিয়ে ৮০ কোটি টাকা থাকে। এর মধ্যে ১০ কোটি টাকার গিফট—হানিমুন প্যাকেজ। আর বাকি ৭০ কোটি টাকা দিয়ে হোটেল নির্মাণ করব।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কিন্তু ১৫০ কোটি টাকার প্রজেক্টের মধ্যে হোটেল বানাতেই তো ৭০ কোটি যাচ্ছে?”
তিনি মিষ্টি হেসে বললেন,
“হ্যাঁ স্যার। হোটেলটা আসলে ফোর-স্টার মানের হবে। তবে আপনি ফাইভ-স্টার ভেবে নিতে পারেন।”
আমি তখন চুপ।
তিনি আবার বললেন,
“তবে সত্যিকারের ফাইভ-স্টার হোটেলের মালিকানা নিতে চাইলে আমাদের আরেকটি প্রজেক্ট আছে। সেটার শেয়ার মাত্র সাত লাখ টাকা। নেবেন?”
এই প্রশ্নের পর আর কোনো হিসাব করিনি।
চুপচাপ উঠে দাঁড়ালাম।
তারপর সোজা উল্টো দিকে হাঁটা দিলাম।
“থাক বোন। এই টাকা দিয়ে বরং তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করব। অন্তত ব্যবসাটা কী, কোথায় টাকা যাচ্ছে—সেটা বোঝার চেষ্টা করা যাবে।”
হোটেলের মালিক হওয়ার স্বপ্নটা সেদিন আর পূরণ হলো না।
তবে একটা শিক্ষা হলো—
“মাত্র তিন লাখ টাকায় পাঁচ তারকা হোটেলের মালিক”—এই কথাটা শুনে প্রথমে হোটেলটা কত সুন্দর হবে সেটা না ভেবে, আগে হিসাব করুন আপনার টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে।
কারণ বিজ্ঞাপনে সুইমিংপুল দেখা যায়,
কিন্তু হিসাবের পানিতে ডুবে গেলে সাঁতার কাটার সুযোগ নাও থাকতে পারে!


















