আফরিন মিম
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্ব’পর্যায়ে উন্নীত করার এবং ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাষ্ট্রদূতের ভাষায়, এটি এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি কাঠামো।
ইয়াও ওয়েন বলেন, দুই দেশ উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ আরও জোরদার করবে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের নতুন ব্যবস্থা চালু করবে। পাশাপাশি সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ সম্প্রসারণেও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে চীনের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। চীন সবসময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে থাকবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, সফরে উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীন উন্নয়নপথের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে যাবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে ইয়াও ওয়েন জানান, উভয় দেশ উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি জানান, চীনে বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রচার কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, সফরের সময় বাংলাদেশের তাজা কাঁঠাল চীনে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে আম ও পেয়ারার পর এবার বাংলাদেশের কাঁঠালও চীনের বাজারে প্রবেশ করবে। ভবিষ্যতে আরও উচ্চমানের বাংলাদেশি কৃষিপণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনাও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, এ বিষয়ে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কাজ এগিয়ে নেবেন।
এ ছাড়া দুই দেশ আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানে একমত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-চীন সরাসরি যোগাযোগ এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, উভয় দেশ জাতিসংঘ সনদভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপাক্ষিকতাকে সমর্থনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে সমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সংলাপ অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনকে চীন সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
ইয়াও ওয়েন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আগামী দিনে সফরে অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে এবং উভয় দেশের জনগণ এর সুফল ভোগ করবে।
সিএমজি বাংলা





















