মধ্যরাত। মাথার ওপর তারাভরা আকাশ। চারদিকে নিস্তব্ধতা। নরসিংদীর চরসিন্দুরের চরে নিজের ক্ষীরাখেতের এক পাশে সতর্ক শিকারির মতো বসে আছেন কৃষক বুরুজ মিয়া। সে বছর ক্ষীরার ফলন বেশ ভালো হয়েছে। বাজারে দামও সন্তোষজনক। কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে হলে রাতদিন খেত পাহারা দিতে হয়। কারণ, মানুষের পাশাপাশি কিছু বন্য প্রাণীরও নজর পড়ে ফসলের ওপর। বুরুজ মিয়া সেদিন অপেক্ষা করছেন তেমনই এক রহস্যময় আগন্তুকের।
রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ খেতের ভেতর থেকে ভেসে এল পরিচিত এক শব্দ। এই শব্দের অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি। আর দেরি না করে খেত থেকে বেরিয়ে সোজা হাঁটা ধরলেন শীতলক্ষ্যা নদীর দিকে। এক হাতে শুকনো ছাইভর্তি পাটের ব্যাগ, অন্য হাতে বাঁশের লাঠি।
নদীর পাড়ে পৌঁছে টর্চের আলোয় খুঁজতে লাগলেন কিছু একটা। অবশেষে পেয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত চিহ্ন। প্রাণীটি নদীর দিক থেকে বুকে ভর দিয়ে এ পথেই ক্ষীরাখেতের দিকে এসেছে। বুরুজ মিয়া পথটি ধরে কিছুটা এগিয়ে নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে দিলেন শুকনো ছাই। তারপর দ্রুত ফিরে এলেন খেতে।

খেতের ভেতরে ঢুকে এবার প্রাণীটিকে তাড়া করতে শুরু করলেন। সাপের মতো ফোঁসফোঁস শব্দ করতে করতে প্রাণীটি এঁকেবেঁকে ছুটতে লাগল নদীর দিকে। কিন্তু ছাই বিছানো জায়গায় পৌঁছাতেই থমকে গেল তার গতি। কিছুক্ষণ ছটফট করে গড়াগড়ি খেতে লাগল মাটিতে। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন বুরুজ মিয়া। লাঠি হাতে এগিয়ে গিয়ে আঘাত করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিথর হয়ে গেল প্রাণীটি।
প্রায় চার ফুট লম্বা, সাত কেজি ওজনের অদ্ভুত দর্শন প্রাণীটি শিকার করে বুরুজ মিয়ার আনন্দের সীমা নেই। স্থানীয় মানুষের মুখে প্রচলিত ছিল, এর মাংসের স্বাদ অনেকটা খাসির মাংসের মতো।
কিন্তু প্রাণীটি আসলে কোনো স্থলচর বন্য জন্তু নয়। এটি একধরনের মাছ! একসময় নরসিংদীর চরসিন্দুর এলাকার কৃষকেরা এভাবেই ছাই ব্যবহার করে শিকার করতেন অদ্ভুত এই মাছ। লোকমুখে যার নাম বাহোক।
নদীর মাছ, অথচ বিচরণ ডাঙায়!
শীতলক্ষ্যার খাড়া পাড়ের গভীর গর্তে বসবাস করতে পছন্দ করে বাহোক। কিন্তু স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতায়, গভীর রাতে কখনো কখনো এরা নদীর পানি ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসত। কখনো নদীর পাড়ঘেঁষা ঝোপঝাড় পেরিয়ে চলে যেত ফসলের খেতে। ক্ষীরাখেতে এর আনাগোনা এতটাই পরিচিত ছিল যে কোনো কোনো এলাকায় মাছটির নামই হয়ে গেছে ‘ক্ষীরাবাইম’।
স্থানীয় মানুষের মুখে শোনা যায়, ক্ষীরা, শসা, সরিষা এমনকি ধানের সন্ধানেও নাকি নদীর পাড় থেকে অনেক দূর চলে যেত এই মাছ। নদীতীরবর্তী বাড়ির গোলাঘরে ঢুকে ধানের গোলা ফুটো করার গল্পও প্রচলিত আছে। তবে এসব গল্প মূলত স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও লোকবিশ্বাসের অংশ। বৈজ্ঞানিকভাবে বাহোকের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস কিন্তু ভিন্ন। এটি মূলত মাংসাশী মাছ।
আমার নিজেরও বাহোকের সঙ্গে পরিচয় শীতলক্ষ্যা নদীকে ঘিরেই। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীতে একসময় প্রচুর বাহোক দেখা যেত। প্রথমবার মাছটির দেখা পেয়েছিলাম এক গভীর রাতে। ছিপ ফেলে বোয়াল মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ দেখি, আমার পাশ দিয়েই নদী থেকে উঠে চরের দিকে চলে যাচ্ছে অদ্ভুত এক প্রাণী।
দ্বিতীয়বার দেখেছিলাম চাঁদনি রাতে, একটি ক্ষীরাখেতের মধ্যে। সেবার প্রাণীটিকে চিনতে না পেরে অদ্ভুত এক সাপ ভেবে গুলি করে মেরেছিলাম। দেখতে অনেকটা নাদুসনুদুস সাপের মতো। জলপাই রঙের লম্বাটে শরীর, দৈর্ঘ্য প্রায় চার ফুট। ছোটবেলা থেকেই মাছটিকে বাহোক নামে চিনতাম। কেউ কেউ একে বাসুকি মাছও বলতেন। গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত ছিল, এই মাছ নাকি একসময় সাপ ছিল।
বাহোক, বাসুকি কিংবা বাসুক—নামগুলোর সঙ্গে প্রাচীন বেহুলা-লখিন্দরের উপাখ্যানের বাসুকি নাগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা গবেষণার বিষয়। তবে মাছটিকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে যে বিচিত্র লোকবিশ্বাস ও কল্পকাহিনি গড়ে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে কৌতূহলোদ্দীপক।
আঞ্চলিকভাবে মাছটির আরও কিছু নাম রয়েছে। কোথাও একে বলা হয় তেলকোমা, কোথাও বাওবাইম বা বামোশ। ইংরেজিতে পরিচিত Indian mottled eel বা Indian longfin eel নামে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Anguilla bengalensis।
শীতলক্ষ্যার বিশালদেহী শিকারি
বাহোক আকারে বেশ বড় হতে পারে। একসময় শীতলক্ষ্যা নদীতে বড় বড় বাহোক ধরা পড়ত। ১৯৮৮ সালে চরসিন্দুরের বান্ধব কটন মিলের কেয়ারটেকার রহমান মিয়া চিতল মাছ ধরার কোপা বড়শিতে একটি বিশাল বাহোক পেয়েছিলেন। মাছটির ওজন ছিল প্রায় ৯ কেজি, দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ ফুট।
যাঁরা রাত জেগে বড়শিতে কেঁচো গেঁথে বোয়াল মাছ ধরতেন, তাঁদের বড়শিতেও প্রায়ই আটকা পড়ত বাহোক। মাছটি ছিল অসম্ভব শক্তিশালী ও দুর্দান্ত শিকারি। ডাঙায় উঠে আসার অদ্ভুত স্বভাবের পাশাপাশি পানির নিচেও তার শিকারি চরিত্রের নানা গল্প প্রচলিত ছিল।
বাবার কাছে শুনেছি, বাহোক এতটাই বেপরোয়া শিকারি ছিল যে নদীতে মাছ ধরার জন্য পেতে রাখা চাইয়ের ভেতর ঢুকে অন্য মাছ খেয়ে ফেলত। কখনো কখনো চাই ভেঙেই পালিয়ে যেত। অর্থাৎ শুধু আকারে বড় হওয়াই নয়, শক্তি ও শিকারি দক্ষতার দিক থেকেও মাছটি ছিল বেশ দাপুটে।
বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, বাহোক মূলত নিশাচর মাংসাশী। ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এর প্রধান খাদ্য। রাতের অন্ধকারে শিকার ধরতে এটি বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে ক্ষীরা, শসা কিংবা ধান খাওয়ার যেসব গল্প স্থানীয় মানুষের মুখে শোনা যায়, সেগুলোকে মাছটির প্রকৃত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই।
কৈশোরের একটি স্মৃতিও এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে। বাজার থেকে কেনা কাচকি মাছের মধ্যে প্রায়ই সাদা রঙের সাপের বাচ্চার মতো কিছু প্রাণী দেখতে পেতাম। সেগুলো কেউ খেত না। মা আমার জন্য আলাদা করে রেখে দিতেন। আমি সেগুলো ছোট ছোট করে কেটে বড়শিতে গেঁথে শোল মাছ ধরতাম। তখন মনে করতাম, এগুলো বুঝি বাহোক মাছের বাচ্চা।
পরে খ্যাতিমান লেখক হরিপদ দত্তের কাছে এ বিষয়ে জানতে পেরেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, বাহোকের ছোট অবস্থার মাছ কাচকির ঝাঁকের সঙ্গে মিশে থাকত এবং কাচকি মাছ খেত। বৈশাখ মাসে কাচকির সঙ্গে বেলজালেও উঠে আসত এসব ছোট মাছ।
হরিপদ দত্ত নিজেও শীতলক্ষ্যাপারের মানুষ। বাহোক কিংবা বাসুকি মাছ নিয়ে তাঁরও রয়েছে অনেক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা। নদীকে ঘিরে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে বাহোক যে কেবল একটি মাছ নয়, বরং শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিরও অংশ, তাঁর কথায় সেটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সমুদ্র থেকে নদী, আবার নদী থেকে সমুদ্রে
বাহোকের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এর প্রজনন ও জীবনচক্র। সাধারণভাবে আমরা মাছের জন্ম ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে নদী, পুকুর কিংবা সমুদ্রের পরিচিত পরিবেশকে মিলিয়ে দেখি। কিন্তু বাহোকের জীবনচক্রে রয়েছে দীর্ঘ এক যাত্রা।
বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, বাহোকের জন্ম সমুদ্রে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর এর লার্ভা স্বচ্ছ ও পাতার মতো চ্যাপ্টা হয়। এই লার্ভাগুলো সমুদ্রের স্রোতে ভেসে ধীরে ধীরে উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে আসে। পথপরিক্রমায় এদের শরীরের গঠন ও আকৃতিতে পরিবর্তন ঘটে। একপর্যায়ে এরা স্বচ্ছ ছোট ইলের মতো ‘গ্লাস ইল’ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর নদী ও মোহনা হয়ে মিঠাপানির পরিবেশে প্রবেশ করে।
বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের স্বচ্ছ রং বদলে যায়। ধীরে ধীরে ধূসর, বাদামি কিংবা জলপাই রঙের আবরণ তৈরি হয়। পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় শরীরে দেখা যায় গাঢ় ছোপ। নদী কিংবা মিঠাপানির অন্যান্য জলাশয়ে কয়েক বছর কাটানোর পর প্রজননের সময় আবার সমুদ্রের উদ্দেশে যাত্রা করে।
এখানেই বাহোকের সঙ্গে ইলিশের জীবনচক্রের চমৎকার একটি পার্থক্য দেখা যায়। ইলিশ প্রজননের জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে আসে। অন্যদিকে বাহোক মিঠাপানির নদী থেকে সমুদ্রে ফিরে যায় প্রজননের উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ একটির যাত্রা সমুদ্র থেকে নদীতে, অন্যটির নদী থেকে সমুদ্রে। প্রকৃতির এই বিপরীতমুখী যাত্রা মাছ দুটির জীবনচক্রকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
শীতলক্ষ্যা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাহোক?
একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল ও পাহাড়ি জলধারায় বাহোকের বিচরণ ছিল। শীতলক্ষ্যাও ছিল এর অন্যতম আবাসস্থল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর পরিবেশে এসেছে বড় পরিবর্তন। শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য দূষণে নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। নদীর তলদেশ ও পাড়ের প্রাকৃতিক আবাসস্থলও নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত মাছ আহরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে গত দুই দশকে শীতলক্ষ্যা নদীর কোথাও বাহোকের সন্ধান পাইনি। একসময় যে নদীতে রাতের অন্ধকারে এই মাছ ডাঙায় উঠে আসত, সেখানে এখন তার দেখা মেলা কঠিন। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটবাজারে, এমনকি রাজধানী ঢাকার মাছের আড়তেও মাঝেমধ্যে বাহোক দেখা যায়। অর্থাৎ দেশের কোথাও কোথাও এখনো এর অস্তিত্ব রয়েছে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, মাছটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানাশোনা খুবই সীমিত। এর অদ্ভুত জীবনযাপন, ডাঙায় উঠে আসার প্রবণতা এবং বিশালদেহী গড়নকে ঘিরে নানা গল্প ও কল্পকাহিনি প্রচলিত রয়েছে। অথচ এই মাছের প্রকৃত জীবনচক্র, বিচরণক্ষেত্র, খাদ্যাভ্যাস ও প্রজনন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
বাহোকের গল্প আসলে শুধু একটি বিচিত্র মাছের গল্প নয়; এটি আমাদের নদী, নদীপারের মানুষের জীবন, লোকজ বিশ্বাস এবং হারিয়ে যেতে বসা জীববৈচিত্র্যের গল্প। একসময় যে মাছ গভীর রাতে শীতলক্ষ্যার বুক ছেড়ে ক্ষীরাখেতে উঠে আসত, ছাইয়ের ওপর গড়াগড়ি খেত, কৃষকের লাঠির আঘাতে প্রাণ হারাত—আজ সেই মাছের দেখা পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে।
নদী শুধু পানি বহন করে না, বহন করে অসংখ্য প্রাণের অস্তিত্ব, মানুষের স্মৃতি ও একটি অঞ্চলের ইতিহাস। শীতলক্ষ্যা থেকে বাহোক হারিয়ে যেতে থাকলে হারিয়ে যাবে আমাদের জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও। তাই মাছটির আবাসস্থল রক্ষা, এর বিচরণ ও প্রজনন নিয়ে গবেষণা এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নইলে একদিন হয়তো বাহোকের অস্তিত্ব খুঁজতে হবে শুধু পুরোনো মানুষের স্মৃতিতে, আর তার ডাঙায় উঠে আসার গল্পগুলো জায়গা করে নেবে নিছক লোককথার পাতায়।




















