চীন ডায়েরি: এক বাংলাদেশি ছাত্রের চোখে চীন-জীবনের গল্প - Mati News
Saturday, June 13

চীন ডায়েরি: এক বাংলাদেশি ছাত্রের চোখে চীন-জীবনের গল্প

আব্দুর রউফ

যে দিনটার কথা বলব, সেটা ২০২২ সালের নভেম্বর, তখন বিশ্ব জুড়ে করোনা মহামারীর প্রকোপ কিছুটা কমেছে। গুয়াংঝৌ বিমানবন্দরে নেমে প্রথম যে জিনিসটা খেয়াল করলাম, তা হলো নীরবতা। চারপাশে মানুষ হাঁটছে, কথা বলছে, কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো সিনেমার সাউন্ডট্র্যাক ছাড়া দৃশ্যে আছি, সবকিছু দৃশ্যমান, কিন্তু অর্থহীন। হাতে একটা লাল স্যুটকেস, পকেটে চার শব্দের চীনা ভাষাজ্ঞান “নী হাও” (হ্যালো), “শিয়ে শিয়ে” (ধন্যবাদ), “দুই বু চি” (সরি), আর “ওয়া বু মিংবাই” (আমি বুঝি না)। শেষ শব্দটা পরবর্তী ছয় মাসে আমার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা বাক্য হতে যাচ্ছে সেটা তখনো জানি না।

লেখক

এখন বসে আছি নানজিং-এর জিয়াংজুন রোডে, নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস (এনইউএএ)-র লাইব্রেরির সামনে। হাতে এক কাপ গরম লংজিং চা। সামনে ক্যাম্পাসের প্লেন ট্রি-গুলোর পাতা বাতাসে কাঁপছে। আজ এই লেখা লিখতে লিখতে ভাবছি এতটা পথ কীভাবে এলাম?

প্রথম দিন, প্রথম ধাক্কা

নানটং ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে প্রথম রাতের কথা কোনোদিন ভুলব না। যে রুমে থাকব, সেখানে ঢুকেই দেখি চারটা বেড, তিনজন ইতোমধ্যে এসে গেছে। একজন নাইজেরিয়ান, একজন পাকিস্তানি, একজন ঘানার। ওরা সবাই ইংরেজিতে কথা বলছে, কিন্তু উচ্চারণ এতই আলাদা যে আমার কানে যেন অচেনা সুর লাগছিল। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি এসে এই বহুভাষিক, বহুজাতিক পরিবেশে নিজেকে অচেনা লাগছিল।

প্রথম সকালে ক্যান্টিনে গেলাম। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মেন্যু বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছি সব চীনা অক্ষর। দোকানের আন্টি জিজ্ঞেস করছেন কিছু, আমি হতভম্ব। শেষে ফোন বের করে গুগল ট্রান্সলেট অ্যাপ খুললাম। টাইপ করলাম: “আমি কী খেতে পারি?” উনি স্ক্রিনে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর নিজের ফোনে টাইপ করে দেখালেন: “তুমি কি চিকেন খাও?” আমি মাথা নাড়লাম জোরে জোরে। সেই প্রথম চীনে পেট ভরে খাওয়া এক বাটি স্টিমড রাইস, চিকেন উইথ মাশরুম, আর এক প্লেট স্ট্র-ফ্রাইড ভেজিটেবল। খেতে খেতে মায়ের হাতের রান্নার কথা খুব মনে পড়ল। ঢাকার বাসার কথা মনে পড়ল। সেই দিনই ঠিক করেছিলাম চীনা ভাষা শিখতেই হবে। কারণ খাবার অর্ডার করার জন্য প্রতিবার গুগল ট্রান্সলেট খোলা যায়, কিন্তু বন্ধুত্ব করতে গেলে ভাষা চাই।

ভাষার সাথে যুদ্ধ

পরের মাসগুলো ছিল এক অদ্ভুত যুদ্ধ। ক্লাসে প্রফেসর ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু উচ্চারণ এতটাই চীনা ঘরানার যে প্রথম দিকে কিছুই বুঝতাম না। একদিন ক্লাসে প্রফেসর “থ্রি” বলছিলেন, আমি শুনলাম “ট্রি”। ক্যাম্পাসের বাইরে গেলে অবস্থা আরও খারাপ। একবার দোকানে গিয়ে মোজা কিনতে চাই। দোকানি জিজ্ঞেস করলেন কী সাইজ। আমি বললাম “লার্জ” কিন্তু দোকানি কিছুই বুঝতে পারলো না। শেষে এক চীনা সহপাঠী ফোনে এসে আমার হয়ে কথা বলে দিল। এভাবেই শিখেছি, প্রতিটি ভুল ছিল একেকটা ক্লাসরুম, যেখানে শিক্ষক ছিল পরিস্থিতি নিজেই।

আস্তে আস্তে ভাষা আসতে শুরু করল। প্রথম যখন একা একা দোকানে গিয়ে পুরো কথোপকথন চীনা ভাষায় শেষ করতে পেরেছিলাম “ওয়া ইয়াও ই গে রৌ বাওজি” (আমি একটা চিকেন বাওজি চাই) দোকানি মুচকি হেসে বললেন, “নি দা চোংওয়েন হেন হাও” (তোমার চীনা ভাষা খুব ভালো)। সেই ছোট্ট প্রশংসাটা যেন অলিম্পিক পদক পাওয়ার মতো লেগেছিল।

Figure 2লেখক

নানটং থেকে নানজিং: দুই শহরের গল্প

নানটং-এ কাটিয়েছি চার বছর। জিয়াংসু প্রদেশের এই ছোট্ট উপকূলীয় শহরটাকে চীনারা বলে “দীর্ঘায়ুর শহর” এখানকার বয়স্ক মানুষেরা আশ্চর্যজনকভাবে সুস্থ ও দীর্ঘজীবী। নদীর পাশে ক্যাম্পাস, গাছের ছায়ায় ঢাকা রাস্তা, আর রাতের বাজারে স্টিমড ডাম্পলিং-এর ধোঁয়া নানটং যেন এক শান্ত আশ্রম ছিল আমার জন্য। সেখানেই প্রথম চীনের শীত দেখলাম। বাংলাদেশের শীত মানে কুয়াশা আর কম্বলমোড়া সকাল, নানটং-এর শীত মানে হাড়কাঁপানো হাওয়া আর তুষারপাতের অপেক্ষা। প্রথম বরফ দেখে পাগলের মতো দৌড়ে বাইরে গিয়েছিলাম, হাত পেতে ধরেছিলাম সাদা ফুলকিগুলো। সিকিউরিটি গার্ড আঙ্কেল (শুশু) আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন, তার সহকর্মীদেরকে বলছিলেন বাংলাদেশি এই ছেলেটা বোধহয় প্রথম বরফ দেখছে!

তারপর এলো নানজিং। ২০২৫ সালে যখন মাস্টার্সের জন্য এনইউএএ-তে ভর্তি হলাম, তখন যেন আরেক চীন দেখতে শুরু করলাম। নানজিং এক ভিন্ন শহর, ছয় রাজবংশের প্রাচীন রাজধানী, মিং সমাধির শহর, আবার অত্যাধুনিক মেট্রোর শহরও বটে। ১৫ টি মেট্রো লাইনের জালে ঢাকা এই নগরী যেন ইতিহাস আর ভবিষ্যতের এক অভূতপূর্ব মিশেল।

প্রথম সপ্তাহেই গিয়েছিলাম ছিনহুয়াই নদী ধারে। সন্ধ্যার সময় লাল লন্ঠনের আলোয় নদীটা যেন জ্বলজ্বল করছিল। ফুঝিমিয়াও (কনফুসিয়াস মন্দির) এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমি কি সত্যিই সেই ছেলে, যে চার বছর আগে নানটং বিমানবন্দরে দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল?

ক্যাম্পাস জীবন

এনইউএএ-র জীবন অন্য রকম। বিশ্ববিদ্যালয়টা অ্যারোনটিকস ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্য বিখ্যাত। প্রজেক্ট ২১১-এর আওতাধীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১০০০ আন্তর্জাতিক ছাত্র পড়ছে। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গাটা হলো জিয়াংজুন রোড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরি; বিশাল কাঁচের দালান, ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি। এখানে বসে পড়তে পড়তে কখনো কখনো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, দূরে জিজিন পর্বতের চূড়া কুয়াশায় ঢাকা।

আমার রুমমেট একজন ঘানার নাম কোয়াম। ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা অন্যরকম। ও যখন বলে আফ্রিকায় আমরা এমন করি, আমি বলি বাংলাদেশে আমরা এমন করি। রান্নাঘরে ওর জোলফ রাইস আর আমার বিফ কারি মিলেমিশে যে গন্ধ ছড়ায়, সেটা যেন দুই মহাদেশের মৈত্রীর সুবাস। একবার কোয়ামকে বললাম, “তোমরা যে এত টমেটো দিয়ে রান্না কর!” ও হেসে বলল, “তোমরা যে এত মসলা দাও, তাতেই তো আমি অবাক!”

খাবার, ট্রেন, আর দৈনন্দিন চীনের গল্প

চীনে থেকে যে জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছে সেটা হলো খাবারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। নানজিং-এর সিগনেচার ডিশ হলো নানজিং রোস্টেড ডাক। প্রথমবার খেয়ে মনে হয়েছিল এ যেন ঢাকার হাজারীবাগের রোস্টের চীনা সংস্করণ! এরপর একে একে আবিষ্কার করেছি তাংবাও (স্যুপ ডাম্পলিং), শেংজিয়ানবাও (প্যান-ফ্রাইড বান), আর শিজি মিটবল প্রতিটা যেন নতুন কোনো রাজ্যের চাবি খুলে দিয়েছে।

সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন যাই ১৯১২ ডিস্ট্রিক্টে নানজিং-এর এই রেস্তোরাঁ এলাকাটা পুরনো রিপাবলিকান স্থাপত্যে ঘেরা। এক বাটি নুডলস খেতে খেতে যখন দেখি পাশের টেবিলে চীনা পরিবার তাদের বাচ্চাকে নিয়ে এসেছে, বাবা বাচ্চাকে চপস্টিক ধরানো শেখাচ্ছে তখন কেমন যেন নিজের বাবাকে মনে পড়ে যায়। দূরত্বটা ৩,০০০ কিলোমিটারের, কিন্তু আবেগের দূরত্ব তো শূন্য!

আর হাই-স্পিড ট্রেন? বাংলাদেশের বাসে চড়ে ঢাকা থেকে রাজশাহী যেতে যে কষ্ট হয়, এখানে সেই একই সময়ে বেইজিং থেকে সাংহাই পৌঁছে যাওয়া যায় আরামে বসে, জানালা দিয়ে বাইরের ধানক্ষেত আর শহরগুলোর ছবি তুলতে তুলতে। ট্রেনের ভেতরকার নীরবতা আমার প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগত, বাংলাদেশে ট্রেন মানেই হইচই, চা-ওয়ালার ডাক, সহযাত্রীদের গল্প। এখানে সবাই হেডফোনে ডুবে থাকে, অথবা ল্যাপটপ খুলে কাজ করে। পরে বুঝেছি এটা আরাম নয়, এটা সম্মানের প্রকাশ। অন্যের ব্যক্তিগত সময়কে সম্মান করা।

যে শিক্ষা বইয়ে নেই

চীনে থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা পেয়েছি, সেটা কোনো ক্লাসের পাঠ্যক্রমে নেই। এ শেখাটা হলো মানুষ আসলে সর্বত্রই এক। চীনের বৃদ্ধা যে গল্প বলেন তাঁর নাতির নিয়ে, বাংলাদেশের দাদিও ঠিক একইভাবে বলেন। চীনা বাচ্চারা যেভাবে দুষ্টুমি করে, বাংলাদেশি বাচ্চারাও ঠিক সেভাবেই করে। উৎসবের আনন্দ, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা, প্রেমের টানাপোড়েন এগুলোর কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। তবে কিছু পার্থক্যও চোখে পড়েছে। চীনাদের শৃঙ্খলাবোধ প্রায় কিংবদন্তিতুল্য। নির্ধারিত সময় মানেই নির্ধারিত সময়, ৯টা ৫ মিনিটে আসা মানে দেরি করা। বাংলাদেশের “বাংলা টাইম” এখানে চলবে না। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো, এখন মনে হয় এই শৃঙ্খলাবোধটাই হয়তো আমাদের শেখা উচিত।

আর নিরাপত্তা। রাত ২টায় একা রাস্তায় হাঁটতে যে নির্ভয়বোধ হয়, তা বাংলাদেশে কল্পনাও করতে পারি না। চীনের নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে বাইরের বিশ্বে সমালোচনা আছে, কিন্তু ছাত্র হিসেবে আমি যেটা অনুভব করেছি সেটা হলো এক অদ্ভুত সুরক্ষার অনুভূতি। মেয়ে বন্ধুদের কাউকে কখনো বলতে শুনিনি যে তারা রাতে বেরোতে ভয় পায়। চীন আমাকে শিখিয়েছে যে পৃথিবীটা আসলে অনেক বড়, কিন্তু একই সঙ্গে অনেক ছোট। শিখিয়েছে যে ভাষার বাধা সত্যি, কিন্তু সেতুও সত্যি। শিখিয়েছে যে উন্নয়ন মানে শুধু আকাশছোঁয়া বিল্ডিং নয়, উন্নয়ন মানে নিরাপদ রাস্তা, সময়নিষ্ঠ ট্রেন, আর প্রতিটি মানুষের জন্য সুযোগের সমতা।

লেখক: শিক্ষার্থী, নানজিং ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *