শাসন, সংস্কার ও উন্নয়ন: চীনের উত্থানের নেপথ্য কৌশল - Mati News
Saturday, June 13

শাসন, সংস্কার ও উন্নয়ন: চীনের উত্থানের নেপথ্য কৌশল

তাসরিফ আহাদ তীর্থ

বিশ শতকের শেষ দিকে যে দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র কয়েক শত ডলার, আজ সেই দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এত অল্প সময়ে চীনের এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল, যে কৌশল বিশ্বের বহু দেশ অনুকরণের চেষ্টা করছে, আবার অনেকে করছে সমালোচনা। চীনের শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন মডেল নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। একদিকে লিবারেল গণতন্ত্রের পণ্ডিতরা বলছেন, চীনের এই উন্নয়ন টেকসই নয়, কারণ এতে রাজনৈতিক স্বাধীনতার জায়গা নেই। অন্যদিকে বহু উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকরা চীনের মডেলকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে দেখছেন। এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে চীনের বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি।

একদলীয় রাষ্ট্রে বহুস্তরীয় শাসন

চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধারণার সাথে মেলে না। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) ১৯৪৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায়, এবং এই পার্টির নেতৃত্বেই দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিচালিত হয়। কিন্তু একদলীয় শাসন মানেই অব্যবস্থাপনা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা এই ধারণাটি চীনের ক্ষেত্রে সত্য নয়। চীনের শাসনকাঠামো বস্তুত বহুস্তরীয়। কেন্দ্রে দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা হিসেবে কাজ করে পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটি । নিচে রয়েছে প্রদেশ, শহর এবং কাউন্টি পর্যায়ের সরকার। এই স্তরগুলো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যা সমাধানেও ভূমিকা রাখে। মজার বিষয় হলো, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার একটি অদৃশ্য প্রক্রিয়া কাজ করে, কোন প্রদেশ বা শহর বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারল, সেটি নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান, যা উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াও হঠাৎ করে নেয়া হয় না। বড় কোনো নীতি গ্রহণের আগে বছরের পর বছর বিভিন্ন স্থানে পাইলট প্রকল্প চালানো হয়। এই প্রকল্পে ভালো ফলাফল পেলে তবেই তখন জাতীয়ভাবে সম্প্রসারিত হয়, না হলে বাদ দেওয়া হয়। শেনজেনকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা, তারপর সেই মডেল সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া এটি সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

১৯৭৮-এর সংস্কার

চীনের আধুনিক অর্থনৈতিক গল্প শুরু হয় ১৯৭৮ সালে, যখন দেং শিয়াওপিং “সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ” নীতি ঘোষণা করেন। সেই সময় চীনের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ১৫৬ ডলার। আর চীন আজ বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎপাদনশীল অর্থনীতির দেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ৯ শতাংশের বেশি যা টানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। এই ধরনের প্রবৃদ্ধির নজির বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে বিরল।

দেং-এর সংস্কারের মূল স্তম্ভগুলো ছিল: কৃষিব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জায়গা দেওয়া। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পুঁজিবাদী হাতিয়ার ব্যবহার, এই বৈপরীত্যটিই চীনের উন্নয়ন মডেলকে অনন্য করে তুলেছে।চীনের সংস্কার একদিনে আসেনি, ধাপে ধাপে এসেছে। প্রথমে কৃষি, তারপর শিল্প, তারপর পরিষেবা খাত। প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে, হয় বিনিয়োগকারী হিসেবে, নয়তো নিয়ন্ত্রক হিসেবে। এই “রাষ্ট্র পরিচালিত পুঁজিবাদ” বা “বাজার সমাজতন্ত্র” যাই বলা হোক না কেন এটি কার্যত একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেলের জন্ম দিয়েছে।

অবকাঠামো: চীনের উন্নয়নের মেরুদণ্ড

চীনের উন্নয়নের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলো তার অবকাঠামো। বিশ্বের দীর্ঘতম হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক এখন চীনেই। ৪০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি হাই-স্পিড রেললাইন, লক্ষাধিক কিলোমিটার মহাসড়ক, বিশ্বমানের বন্দর, বিমানবন্দর ও অত্যাধুনিক শহর ব্যবস্থা এই অবকাঠামোগুলো নির্মাণে চীন ব্যয় করেছে অকল্পনীয় পরিমাণ অর্থ। অবকাঠামোতে বিনিয়োগকে চীন কখনো খরচ হিসেবে দেখেনি, বরং দেখেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার হাতিয়ার হিসেবে। গ্রামীণ অঞ্চলকে শহরের সাথে সংযুক্ত করা, প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের বিস্তার ঘটানো এই প্রতিটি পদক্ষেপ দারিদ্র্য বিমোচনেও সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এই একই দর্শনকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে গেছে। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশে চীন বন্দর, রাস্তা, রেললাইন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়ন করছে। সমালোচকরা বলছেন, এটি ঋণের ফাঁদ; সমর্থকরা বলছেন, এটি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার নতুন অধ্যায়।

দারিদ্র্য বিমোচন: মানব ইতিহাসের অনন্য অর্জন

চীনের উন্নয়নের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় সম্ভবত তার দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে চীন ৮০ কোটিরও বেশি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছে, যা বৈশ্বিক দারিদ্র্য হ্রাসের প্রায় ৭৫ শতাংশ। ১৯৮১ সালে চীনের দারিদ্র্য হার ছিল ৮৮ শতাংশ, ২০১৫ সালে তা নেমে আসে ০.৭ শতাংশে। ২০২১ সালে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে “চরম দারিদ্র্য বিমোচন”-এ সম্পূর্ণ বিজয় ঘোষণা করে। জাতিসংঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য চীন অর্জন করেছে একটি পূর্ণ দশক আগেই।

চীনের দারিদ্র্য বিমোচনের কৌশল ছিল বহুমাত্রিক। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সাথে ছিল লক্ষ্যভিত্তিক পরিবার-পর্যায়ের সহযোগিতা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শহরমুখী অভিবাসনকে সুশৃঙ্খল করা। ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া “লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন” কর্মসূচিতে চীন প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জন্য ব্যক্তিগত সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

ছবি: ইন্টারনেট

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

চীনের উন্নয়ন মডেল বাংলাদেশের জন্য বিশেষ প্রাসঙ্গিক কারণ দুই দেশের সম্পর্ক এই মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ করেছে, সুবর্ণজয়ন্তীর এই উদযাপন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি গভীরতর অংশীদারিত্বের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিতও। অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক দিয়ে দেখলে, চীন এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের একজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ চীন থেকে ১১ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, যেখানে রপ্তানি মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মতো। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে ইতিবাচক খবর হলো, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চীন বাংলাদেশের সমস্ত পণ্যে শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। একটি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে এবং আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে চীনা এফডিআইয়ের পরিমাণ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ২.৬৭ বিলিয়ন ডলারে। অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের চেহারা বদলে দিচ্ছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ আরও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চীনা অর্থায়ন ও প্রকৌশল দক্ষতার ফল। আগামী দিনগুলোতে এক্সপ্রেসওয়ে, ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট এবং স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের মতো উন্নত অবকাঠামোতেও চীন বিনিয়োগে আগ্রহী। চীনের উন্নয়ন মডেল থেকে বাংলাদেশের শেখার সুযোগ আছে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পনীতির ক্ষেত্রে। তবে সরাসরি অনুকরণের বদলে নিজস্ব বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে মডেলটি অভিযোজিত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষ কথা

চীনের উন্নয়ন মডেল নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা দরকার ,কোনো একটি দেশের মডেল কি আক্ষরিক অর্থে অন্য কোথাও রপ্তানি করা যায়? সম্ভবত না। চীনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, বিশাল জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তবে চীন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি এই পাঠগুলো যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের জন্য চীনের সাথে সম্পর্ক একটি কৌশলগত সুযোগ, তবে শর্তহীন অনুসরণ নয়, বরং সুচিন্তিত অংশীদারিত্বের পথে হাঁটাই হবে জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। চীনের উন্নয়নের গল্প থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া এক কথা, আর তার শাসনব্যবস্থাকে আদর্শ ধরা আরেক কথা। বিশ্ব আজ চীনের দিকে তাকিয়ে আছে কেউ শিক্ষা নিতে, কেউ সতর্ক থাকতে। সঠিক পথটি বেছে নেওয়ার দায়িত্ব প্রতিটি দেশের নিজের।

লেখক: শিক্ষার্থী, নানজিং ইউনিভার্সিটি অফ ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *