প্রাচীন চীনের আবিষ্কার : গভীর কূপ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার - Mati News
Friday, March 6

প্রাচীন চীনের আবিষ্কার : গভীর কূপ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার

আজ থাকছে চীনের এমন এক অনবদ্য আবিস্কারের কথা, যা কিনা দুই হাজার দুইশ বছর ধরে আমাদের অনেকের রান্নাঘরে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে আছে। যা ছাড়া আমাদের অনেকের শহুরে জীবনের একটি দিনও কল্পনা করা যায় না। তা হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। সেই সঙ্গে গভীর কূপ খননেও চীন ছিল পথিকৃতের ভূমিকায়। এর মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহ এবং তা সিলিন্ডারে সংরক্ষণ করে গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বহন করা; এসবই বিশ্বকে প্রথম দেখিয়েছিল চীন।

সিছুয়ানের কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ে একদিন মানুষের হাতে ধরা পড়েছিল পৃথিবীর গভীর এক রহস্য। মাটির বুক চিরে উঠে এসেছিল আগুনের নিঃশ্বাস। না, কোনো আগ্নেয়গিরি নয়। সেই আগুন ছিল প্রকৃতির লুকানো সম্পদ – প্রাকৃতিক গ্যাস। আর সেই আগুনকে মানুষ প্রথমবারের মতো ধরে রেখেছিল, বহন করেছিল, ব্যবহার করেছিল এক অদ্ভুত উদ্ভাবনে – বাঁশের নলে। আজকের লোহার গ্যাস সিলিন্ডারের পূর্বপুরুষ সেই বাঁশের টিউব।

China ancient gas drilling

২২৫০ বছর আগে, হান রাজবংশের আমলে সিছুয়ান প্রদেশের লবণের খনিতে শুরু হয়েছিল সেই অভূতপূর্ব অভিযান। লবণ তৈরির জন্য প্রয়োজন ছিল লবণাক্ত পানির, যাকে বলা হয় ব্রাইন। সমুদ্র থেকে লবণ তৈরির পরিবর্তে মাটির গভীর থেকে পানি তুলে তা ফুটিয়ে লবণ বের করা হতো। কিন্তু রয়ে গেল জ্বালানির সমস্যা। জ্বালানি হিসেবে প্রথমে ছিল কাঠের রমরমা ব্যবহার। কিন্তু সেটাও পর্যাপ্ত ছিল না লবণ তৈরির জন্য। এরপর চীনাদের চোখ পড়ল মাটির নিচে। ওই সময়কার চীনা প্রকৌশলীরা গভীর কূপ খুঁড়তে শুরু করলেন। বাঁশের দড়ি, লোহার বিট আর কাঠের লিভার দিয়ে তৈরি হলো খনন ব্যবস্থা। দুই-তিনজন মানুষ লিভারে লাফিয়ে লাফিয়ে ড্রিলকে ওঠানামা করাতেন – ঠিক যেন ধান ভানার ছন্দে। প্রথমে ১০ মিটার, পরের ধাপে পৌঁছে গেল ১৪০ মিটার গভীরে।

আর এরপরই একদিন ঘটে গেল বিস্ময়কর ঘটনা। বেরিয়ে এল প্রাকৃতিক গ্যাসের ফোয়ারা। প্রথমে ভয়, তারপর আনন্দ। প্রাচীন চীনের গবেষকরা বুঝলেন, এই গ্যাস জ্বালানি হিসেবে অমূল্য। কিন্তু কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এই গ্যাস? কীভাবেই বা বহন করবে? এখানেই জন্ম নিল গ্যাস পরিবহনে পাইপলাইন তৈরির ধারণা। হান যুগেই চীনা প্রকৌশলীরা বাঁশ দিয়ে বানালেন পাইপলাইন। বাঁশ কেটে ভেতরটা পরিষ্কার করে, দুই অংশ আঠা দিয়ে জোড়া দিয়ে, দড়ি দিয়ে বেঁধে বানানো হতো বায়ুরোধক পাইপ। আর লাইন ছাড়িয়ে যেত শত কিলোমিটার। এমন একটি পাইপে করে আসতো লবণযুক্ত পানি, আর অন্যটি দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস।

৬১৮-৯০৭ খ্রিস্টাব্দে থাং রাজবংশের সময় এই উদ্ভাবন আরও পরিশীলিত হলো। সিছুয়ানের এক প্রাচীন নথিতে লেখা আছে, ১৮২ মিটার গভীরে আগুনের কূপে মানুষ গ্যাস সংগ্রহ করত বহনযোগ্য বাঁশের টিউবে। ওই টিউবগুলোই ছিল পৃথিবীর প্রথম গ্যাস সিলিন্ডার। বাঁশের নলগুলোয় আছে বায়ুরোধক জয়েন্ট। তাতে একধরনের ট্যাপ বা ভালভ লাগানো যেত। এই নলগুলো কাঁধে নিয়ে যাওয়া যেত অনেক অনেক দূর। পরে জায়গামতো পৌঁছে ভালব খুললেই বেরিয়ে আসতো গ্যাস।

প্রথম দিকে গ্যাস সংগ্রহের জন্য চামড়ার ব্লাডারও ব্যবহার করা হতো প্রাচীন চীনে। একটা ব্লাডারে গ্যাস ভরে ছোট ছিদ্র করে আগুন জ্বালালে সেটা সারাদিন জ্বলত।

গ্যাস যদি বিশুদ্ধ থাকত আর বাতাসের সাথে না মিশত, তাহলে ছিল বিস্ফোরণের ভয়। চীনারা তাই বিশ্বের প্রথম ‘কার্বুরেটর’-এর মতো একটা যন্ত্র বানাল। মাটির নিচে চেম্বারে গ্যাস আর বাতাস মিশিয়ে নিরাপদ করে তারপর সেটা ব্যবহার করত। ‘কাং পেন’ ড্রাম নামের একটা যন্ত্র দিয়ে চাপ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এক কূপ থেকে একসাথে ব্রাইন আর গ্যাস বেরিয়ে আসত, চলে যেত ভিন্ন ভিন্ন পাইপে।

এই উদ্ভাবনের প্রভাব ছিল বিপ্লবী। সিছুয়ানের লবণ শিল্প ফুলে উঠল। ২০০০ বছর আগে এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কূপ খোঁড়া হয়েছে সেখানে। লবণ তৈরি হয়ে সেটা নদীপথে চলে যেত সারা চীনে। কাঠের অভাব মিটে গেল, অর্থনীতি হলো চাঙ্গা। ভাবুন তো, হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যখন কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করত, তখন চীনারা ব্যবহার করতো গ্যাসের চুলা। এমনকি এই গ্যাস শুধু লবণ বানাতে হয়, শহরের আলো জ্বালাতেও ব্যবহার করেছে তারা।

লবণ ও গ্যাসের জন্য চীনা খনন সরঞ্জামের আকার ছিল অসাধারণ। চীনের তৈরি মাটি কাটায় ব্যবহৃত যন্ত্র বা ডেরিকগুলো ১৮০ ফুট পর্যন্ত উঠতে পারত। লবণাক্ত জল তোলার টিউবগুলোও হতো ১৩০ ফুট লম্বা।

ডেরিকটাকে নিচে নামাতে চীনারা ব্যবহার করতো বাঁশের তার। এগুলো তৈরি করা হতো ৪০ ফুট লম্বা স্ট্রিপ দিয়ে। শণের দড়ি যেখানে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৭৫০ পাউন্ড ভর নিতে পারে, বাঁশ সেখানে নিতে পারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ৪ টন ভার।

চীনের মতো ইউরোপে কিন্তু এমন লম্বা বাঁশ ছিল না। ছিল না এর কোনো বিকল্প।  তাই ওই সময় ইউরোপীয়রা চাইলেও মাটির গভীরে ড্রিল করতে পারতো না।

চীনারা এও দেখিয়েছে যে, কূপ খননের জন্য খুব অল্প লোকবলই ছিল যথেষ্ট।  অগভীর কূপে দুজন লোক একটি বোর্ডে লাফ দিয়ে দিয়ে, খননের কাজ করতো। গভীর কূপে ৪ থেকে ৬ জন ছিল যথেষ্ট। সাধারণ ১২ ফুট লিভারের সাহায্যে খনন করার ধারাল প্রান্ত বা বিটটাকে প্রায় ২ ফুট উঁচুতে তুলে ফেলা হত। গর্ত যেন সমান এবং গোল হয় সেজন্য কূপের মুখে একজন কর্মী প্রত্যেক বার লাফানোর সময় তারে মোচড় দিত যাতে গভীরে থাকা ধারালো প্রান্ত বা বিটটি প্রতিবার ভিন্ন কোণে আঘাত করে। এভাবেই বিট ঘুরিয়ে সমান গর্ত তৈরি করা হত।

পরপর কয়েকবার ড্রিলের ধাক্কায় যে ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতো তা ফাঁপা বাঁশের টিউব দিয়ে সাকশন করে বের করা হত, যার শেষে চামড়ার ভালভ থাকত; শিলার টুকরোগুলো খননের প্রথম দিকে কূপে ঢালা পানির সাথে মিশে উঠে আসত। ঠিক একই দৃশ্য এখনও দেখা যায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিউবওয়েল স্থাপনের সময়।

চীনের সিছুয়ান ও চিকংয়ে এমন তিন হাজার থেকে চার হাজার ফুট গভীরতার কূপ পাওয়া গেছে। এমনকি একটি গর্ত ছিল ৯৬০০ ফুট পর্যন্ত।

চীনে ব্যবহারের ১৯০০ বছর পর এই গভীর কূপ খনন ও গ্যাস উত্তোলন প্রযুক্তি ইউরোপে পৌঁছায় উনিশ শতকের শুরুর দিকে। ইউরোপীয়রা ১৮৩০ সালের দিকে লবণের জন্য চীনের দেখানো পথে কূপ খনন শুরু করে। ১৮৪১ সালে চীনের মতো তারাও তেল ও গ্যাসের জন্য কূপ তৈরিতে ব্যবহার করে বো স্ট্রিং ড্রিলিং পদ্ধতি।

আধুনিক যুগে আমরা যখন এলপিজি সিলিন্ডার খুলি, তখন কি মনে পড়ে সেই প্রাচীন চীনা খননকারীদের? যারা বাঁশের নল হাতে পাহাড় পেরিয়ে গ্যাস নিয়ে যেতেন? চীনের প্রাচীন সভ্যতা শুধু গ্রেট ওয়াল বা কাগজ আবিষ্কার করেনি –পৃথিবীর শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম পদক্ষেপও নিয়েছিল তারা। আজ বিশ্বের প্রতিটি রান্নাঘর, কারখানা ও গাড়িতে যে গ্যাস ব্যবহার হয়, তার মূলে রয়েছে সেই প্রাচীন চীনা প্রতিভা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *