ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী
সম্প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন, তেল আবিব থেকে সিডনি—যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইসরায়েল, ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছে। এই বহু-দেশীয় যুদ্ধবিরোধী স্রোত একটি মৌলিক সত্যকে প্রতিফলিত করে: জনগণের শান্তিপূর্ণ জীবন প্রয়োজন, জাতির দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন প্রয়োজন। জীবন যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি মূল্যবান।

মার্কিন জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের প্রধান জো কেন্ট
যুক্তরাষ্ট্রে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর কেবল রাস্তা থেকেই আসেনি, বরং খোদ সরকারের ভিতর থেকেও এসেছে। মার্কিন জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের প্রধান জো কেন্ট ১৭ মার্চ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে লেখা এক খোলা চিঠিতে বলেন: “ইরানের চলমান যুদ্ধকে সমর্থন, আমি বিবেকের কাছে দায়মুক্ত হয়ে, করতে পারছি না। ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো তাত্ক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করেনি। এটা স্পষ্ট যে, ইসরায়েল এবং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের শক্তিশালী লবির চাপে এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।” এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পদত্যাগ চলমান যুদ্ধের বৈধতাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এটি একটি সচেতন মানুষের পক্ষে একটি অন্যায্য যুদ্ধকে ‘নির্ভেজাল মনে’ সমর্থন না করার স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
একই সময়ে, একজন সাবেক মার্কিন নৌ-সেনা কংগ্রেস শুনানিতে উচ্চস্বরে বলেন: “কেউ ইসরায়েলের হয়ে যুদ্ধ করতে চায় না।” মার্কিন অভ্যন্তরীণ এসব কণ্ঠস্বর আসলে সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের প্রধানের পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে—এই যুদ্ধ মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং এটি একটি ফাঁদ যা “মার্কিন দেশপ্রেমিকদের মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং দেশের সম্পদ ও সমৃদ্ধি নষ্ট করেছে।”

ব্রিটেনের বিক্ষোভকারী সাইয়েদ আহমেদ আলওয়াদায়ী
লন্ডনে, হাজার হাজার যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারী টেমস নদীর তীরে জড়ো হয়ে ইরানে বিমান-হামলা বন্ধের দাবি জানায় এবং নির্দোষ হত্যার বিরোধিতা করে। একজন বিক্ষোভকারীর মন্তব্য গভীরভাবে চিন্তা করতে আমাদের বাধ্য করে: “আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আসল চেহারা দেখতে চান, তবে দেখুন তারা ইরানের মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে কতো শিশু হত্যা করেছে!”
মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ এলে, আমাদের একটি মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবর অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৮ জন হয়েছে এবং আহত হয়েছে আরও ৯৫ জন। ১৪৮ জন ছাত্র, ১৪৮টি প্রস্ফুটিত হওয়ার মতো প্রাণ, ১৪৮টি চিরদিনের জন্য ভেঙে পড়া পরিবার!

সংবাদমাধ্যমের ছবিতে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা স্কুলব্যাগগুলো খুব বেশি চোখে লাগে। এই ব্যাগের মালিকরা কোথায়? তাদের বাঁচার অধিকার কে কেড়ে নিল? যুদ্ধের অজুহাত যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন এই শিশুদের জীবনের দায়িত্ব কে নেবে? এটি কেবল ইরানের ট্র্যাজেডি নয়, এটি সমগ্র মানবতার জন্য লজ্জার।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এক বিক্ষোভকারী সত্যি কথাটি বলেছেন: “আমাদের সরকার ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ধরনের আচরণ কোনো যুক্তি দিয়ে সমর্থন করা যায় না।” হ্যাঁ, শিশু হত্যার পক্ষে কোনো অজুহাত দেওয়া যায় না, জীবনের মর্যাদা পদদলিত করার পক্ষে কোনো যুদ্ধের কারণ দেওয়া যায় না।
এই মানবিক বিপর্যয়ের মুখে চীন নীরব থাকেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন চিয়ান ১৭ মার্চ নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন: ইরান, জর্ডান, লেবানন ও ইরাক— এই চার দেশে জরুরি মানবিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন চিয়ান
মুখপাত্র লিন চিয়ান যেমন বলেছেন: “চীন সবসময় মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থের সমন্বিত কমিউনিটির ধারণা বাস্তবায়ন করে এবং আন্তর্জাতিকতাবাদ ও মানবিক চেতনাকে ধারণ করে।” বর্তমানে যুদ্ধ যখন এই অঞ্চলের জনগণের জন্য গভীর মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, চীনের এই সহায়তা কেবল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি ব্যবহারিক সমর্থনই নয়, বরং এটি শান্তি ও জীবনের মূল্যের প্রতি দৃঢ় সমর্থনের প্রতীকও বটে।
বৈশ্বিক যুদ্ধবিরোধী এই আন্দোলন পর্যালোচনা করলে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই: মার্কিন সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের প্রধানের ইস্তফা হোক, লন্ডনের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ হোক, সিডনির বাসিন্দাদের ‘আমেরিকার বিশ্বপুলিশের প্রয়োজন নেই’ স্লোগান হোক, অথবা ওয়াশিংটনের বাসিন্দাদের যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন হোক—সব কণ্ঠস্বর একই দাবিতে একমত: যুদ্ধ বন্ধ করো, জীবন রক্ষা করো।
অস্ট্রেলিয়ার এক বিক্ষোভকারী যেমন বলেছেন: “তারা পুরো বিশ্বের ক্ষতি করছে।” আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধে কোনো বিজয়ী পক্ষ নেই; এতে সাধারণ মানুষই কষ্ট পায়। মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপের স্কুলব্যাগগুলোই এর বাস্তব প্রমাণ।
জীবন যেকোনো কিছুর চেয়ে মূল্যবান, দেশের উন্নয়ন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া সম্ভব নয়। যখন ১৪৮ জন শিশুর প্রাণ যুদ্ধের আগুনে নিভে যায়, যখন বিশ্বজুড়ে জনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে, যখন সচেতন কর্মকর্তারা বিবেকের তাড়নায় পদত্যাগ করে—মানবতার উচিত চিন্তা করা: আমাদের সত্যিই কেমন পৃথিবী দরকার?
উত্তর সম্ভবত এমন: একটি যুদ্ধহীন, জীবনকে মূল্য দেয় এমন, ও পরস্পরকে সাহায্য করে এমন পৃথিবী। আর এটিই চীনের মানবিক সহায়তা প্রদানের মূল লক্ষ্য এবং মানবজাতির অভিন্ন স্বার্থের সমন্বিত কমিউনিটি ধারণার জীবন্ত উদাহরণ। আশা করি, দ্রুত যুদ্ধের আগুন নিভে যাবে এবং সে ভূখণ্ডের মানুষ আবার শান্তিতে বাঁচার অধিকার ফিরে পাবে।
লেখক: পরিচালক, সিএমজি বাংলা




















