চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) সাধারণ সম্পাদক সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেছেন, পার্টির কর্মশৈলীই তার ভাবমূর্তি। এটি জনগণের হৃদয়কে প্রভাবিত করে এবং পার্টির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সিপিসির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে সি চিন পিংকে কেন্দ্র করে গঠিত পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কেন্দ্রীয় আট-দফা বিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মশৈলী উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে ‘চার ধরনের অসদাচরণ’ দমনে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এর ফলে পার্টি ও প্রশাসনের কর্মশৈলীতে পরিবর্তন এসেছে, সমাজে ইতিবাচক রীতিনীতির প্রসার ঘটেছে এবং চীনা জাতির মহান পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য এগিয়ে নিতে নতুন আস্থা ও শক্তি সঞ্চিত হয়েছে।
ফুচিয়ান প্রদেশের শিয়াপু জেলায় সামুদ্রিক খাদ্য সংগ্রহের মৌসুমে ইয়াচেং গ্রামের বাসিন্দাদের পুরনো যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হয়ে দ্বীপে গিয়ে সামুদ্রিক খাদ্য সংগ্রহ করতে হতো। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল প্রবল।
স্থানীয় পার্টির কর্মী-ক্যাডাররা ‘তৃণমূল পর্যায়ে চারবার পরিদর্শন’ কর্মসূচির আওতায় সরেজমিনে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেন। পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়।
বিস্তারিত তদন্তের পর চালু করা হয় ‘সামুদ্রিক খাদ্য সংগ্রহ বাস’ নামে বিশেষ পরিবহন সেবা। এর মাধ্যমে গ্রামবাসীদের নিরাপদ যাতায়াতের সমস্যার সমাধান হয়েছে।
পার্টি গঠনবিষয়ক সি চিন পিংয়ের চিন্তাধারায় কর্মশৈলী উন্নয়নকে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে পার্টির অনেক কর্মী-ক্যাডার উপলব্ধি করছেন, জনগণ নথিপত্রের পুরুত্ব কিংবা স্লোগানের উচ্চতা দিয়ে কর্মশৈলীর মূল্যায়ন করেন না। বরং তারা দেখতে চান, তাদের অভিযোগ শোনা হচ্ছে কি না, কঠিন সমস্যার সমাধানে কেউ এগিয়ে আসছেন কি না, বাস্তবে কাজ হচ্ছে কি না এবং প্রতিটি সমস্যা ও কাজের যথাযথ জবাবদিহি রয়েছে কি না। অর্থাৎ, কর্মশৈলীর প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় জনগণের জন্য বাস্তব কাজ ও কার্যকর ফলাফলের মাধ্যমে।
নতুন যুগের সূচনা থেকে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কেন্দ্রীয় আট-দফা বিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কর্মশৈলী উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নতুন পরিস্থিতিতে কীভাবে কর্মশৈলী গড়ে তুলতে হবে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অসদাচরণ দূর করতে হবে, তার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক সি চিন পিং শতাধিকবার বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন ও তদন্ত-গবেষণা করেছেন। তিনি দেশের নানা প্রান্তে গিয়ে জনগণের সঙ্গে কথা বলেছেন, বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং কার্যকর ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এই কর্মপদ্ধতি পার্টির অন্য সদস্য ও কর্মকর্তাদের জন্য সরেজমিনে তদন্ত, গভীর পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
নতুন যুগে সি চিন পিংকে কেন্দ্র করে গঠিত পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছে এবং সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আনুষ্ঠানিকতাপ্রবণতা, আমলাতান্ত্রিকতা, ভোগবাদ এবং অপচয়-বিলাসিতা—এই ‘চার ধরনের অসদাচরণ’ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খাদ্য অপচয়, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং বিলাসবহুল ক্লাবকেন্দ্রিক অনিয়ম প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
শুধু বাহ্যিক জাঁকজমক বা কৃতিত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পগুলোও সংশোধনের আওতায় এসেছে। তৃণমূল পর্যায়ে সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া, অতিরিক্ত নথিপত্র ও সভার বোঝা, বারবার মূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় তথ্য নথিভুক্তকরণ এবং ঘোষণার তুলনায় বাস্তবায়নের ঘাটতির মতো সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়ম ও জটিল সমস্যার লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে।
সিপিসির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে চীনজুড়ে ‘চার ধরনের অসদাচরণ’-সংক্রান্ত ১৬ লাখ ৪৪ হাজার ঘটনা তদন্ত করে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৪ লাখ ৯৯ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা কেন্দ্রীয় আট-দফা বিধির মূল চেতনা বাস্তবায়নের কার্যকারিতা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি ৯২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা সমাজে পার্টি ও সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণে পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
মিতব্যয়িতা ও অপচয়বিরোধী মনোভাবও সমাজে আরও বিস্তৃত হয়েছে। সততা, সংযম ও যুক্তিবাদকে গুরুত্ব দেওয়া একটি সামাজিক পরিবেশ গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে পার্টি ও সরকারি প্রশাসনের কর্মশৈলী এবং সমাজের সামগ্রিক রীতিনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটছে।
বর্তমানে আরও বেশি তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী-ক্যাডার দাপ্তরিক কাজের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি জনগণের কাছে যাচ্ছেন। তারা উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও ঝুঁকি প্রতিরোধে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন, তৃণমূল পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে স্থানীয় শাসনব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও কার্যকর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পার্টি ও জনগণ এবং সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
(তুহিনা/ফয়সল/শুয়েই)














