আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রেখেই দক্ষিণ চীন সাগরের শান্তি রক্ষা করতে হবে - Mati News
Monday, July 13

আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রেখেই দক্ষিণ চীন সাগরের শান্তি রক্ষা করতে হবে

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

এ বছর তথাকথিত ‘দক্ষিণ চীন সাগর সালিশি মামলার’ অবৈধ রায় ঘোষণার দশ বছর পূর্ণ হলো। এই এক দশকেই প্রমাণ হয়েছে, বাস্তবতা উপেক্ষা করে এবং সীমা লঙ্ঘন করে দেওয়া কোনো রায় পরিণত হয় মূল্যহীন কাগজে। এমন রায় দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক অধিকারকে কোনোভাবেই দুর্বল করতে পারেনি।

ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা
ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক অধিকার দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত। এর সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক ও আইনগত ভিত্তি রয়েছে। ২০০৬ সালে চীন সরকার জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ (আনক্লজ)-এর ২৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি ঘোষণা দেয়, যার মাধ্যমে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ ও ঐতিহাসিক অধিকার-সংক্রান্ত বিরোধকে বাধ্যতামূলক সালিশি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। এটি সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর বৈধ অধিকার। আরও অনেক দেশও একই ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সালিশি ট্রাইব্যুনাল এই মৌলিক আইনি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নিজেই এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা করে রায় দেয়, যা সনদের বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মৌলিক নীতির লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।

এটিও উল্লেখযোগ্য যে, সালিশি ট্রাইব্যুনালের গঠন ও কার্যক্রম ছিল অস্বচ্ছ ও পক্ষপাতদুষ্ট। তাদের রায়টি ছিল বাস্তবতার ভুল মূল্যায়ন এবং আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া। স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করে তাদের সামুদ্রিক অধিকার সৃষ্টির আইনি মর্যাদা অস্বীকার করেছে ট্রাইব্যুনাল, যা দ্বীপ ও প্রবালপ্রাচীরের আইনি অবস্থান সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থী।

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কার্যক্রম দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস বহন করে। এই দীর্ঘ ইতিহাসে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক অধিকার ব্যবস্থা আনক্লজ কার্যকর হওয়ার বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত এবং আন্তর্জাতিক সমাজ দীর্ঘদিন তা স্বীকারও করে আসছে। অথচ ‘সনদে স্পষ্ট উল্লেখ নেই’—এই যুক্তিতে চীনের ঐতিহাসিক অধিকার পুরোপুরি অস্বীকার করেছে ট্রাইব্যুনাল। এটি শুধু ‘স্থলভাগ সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণ করে’—এই মৌলিক আন্তর্জাতিক আইনি নীতিরই পরিপন্থী নয়, বরং সনদের চেতনারও বিরোধী।

এই আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে ছিল একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি কিছু ‘বহিরাগত শক্তি’র প্রভাবে পরিচালিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা নয়; বরং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বৈধ অধিকারকে অস্বীকার করে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করা।

আইনি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ‘আইনের শাসন’-এর নামে আইনের শাসনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বাস্তবতা দেখিয়েছে, এই অবৈধ রায় কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেনি; বরং নতুন বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।

গত এক দশকে চীন ও সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক দেশগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সংলাপ অব্যাহত রয়েছে এবং ‘দক্ষিণ চীন সাগর আচরণবিধি’ প্রণয়নের আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে; বহিরাগতদের চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত ‘রায়ের’ প্রয়োজন নেই।

চীনের অবস্থান বরাবরের মতোই স্পষ্ট—এই সালিশি প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করা হয়নি, এতে অংশও নেয়নি। এটি আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করা নয়; বরং আনক্লজ-এর মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার অবস্থান। চীন সবসময় আন্তর্জাতিক আইনের সমর্থক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিশ্বাসী। চীন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়, তারা যেন ঐতিহাসিক সত্য ও আইনি বাস্তবতাকে সম্মান করে এবং এই অবৈধ রায়ের ভিত্তিতে কোনো দাবি বা পদক্ষেপ না নেয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বহিরাগত দেশগুলোরও উচিত উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিহার করা এবং দক্ষিণ চীন সাগরের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রচেষ্টাকে সম্মান করা।

দশ বছর পেরিয়ে গেছে। সেই অবৈধ রায়ের প্রভাব সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়েছে, কিন্তু চীনের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার সংকল্প দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোর মতোই অটল রয়েছে। চীনের সার্বভৌম অধিকার অস্বীকারের যেকোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে একযোগে দক্ষিণ চীন সাগরকে শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সাগরে পরিণত করতে কাজ করে যাবে চীন।

লেখক: সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা, বেইজিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *