স্বার্থ নয়, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির খোঁজে চীন - Mati News
Sunday, October 25

স্বার্থ নয়, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির খোঁজে চীন

লুৎফর কবির

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে ঝড়ছে বহু নিরীহ মানুষের জীবন। লাশ আর বারুদের গন্ধে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে অঞ্চলটি। বাস্তবতাটা হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মানচিত্রে যুদ্ধের রেখা যতটা দৃশ্যমান, শান্তির পথ ততটাই অনিশ্চিত। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাযেলের হামলা, গাজায় বিপর্যয়, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অমীমাংসিত প্রশ্ন—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির স্থিতিশীলতায় নানা সময় পশ্চিমারা এক টেবিলে বসলেও শান্তির মুখ দেখেনি। এ যখন পরিস্থিতি তখন সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতার বাইরে রাজনৈতিক সংলাপকে সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতায় আরও মনোযোগ দিয়েছে চীন। ইসরায়েল, ফিলিস্তিন ও বাহরাইনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র ধারাবাহিক বৈঠক সেই প্রচেষ্টারই অংশ।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বেইজিংয়ের এমন তৎপরতার গুরুত্ব কেবল শান্তির আহ্বানেই নয় মধ্যপ্রাচ্যের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে যোগাযোগের পরিসর ধরে রাখারও প্রচেষ্টা। তবে, কূটনৈতিক তৎপরতা বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে তা নির্ভর করবে সংঘাতের পক্ষগুলোর সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।

সংঘাতের কেন্দ্রে ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশ্ন

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা বৃদ্ধিবিষয়ক সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিন এবং বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুললতিফ বিন রশিদ আল জাইয়ানির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন ওয়াং ই।

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ চূড়ান্তভাবে খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ ও প্রত্যাহারের ওপর গুরুত্ব দেন। এসব বক্তব্যে চীনের অবস্থানের দুটি দিক স্পষ্ট—তাৎক্ষণিক মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিরোধের লাগাম টানা।

চীনা পররাষ্টমন্ত্রী ওয়াং ই’র মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠা চীনের নীতির মূল ভিত্তি। ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধানে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবস্থাকে সঠিক পথ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি বৈশ্বিক আলোচনায় উপেক্ষিত হতে দেওয়া যায় না।’

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ধারণায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলা হয়। দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এ ধারণা আলোচিত হলেও বাস্তবায়নের পথে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা, বসতি স্থাপন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মতো জটিল প্রশ্ন রয়েই গেছে। ফলে, এ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বাস্তব সমঝোতায় পৌঁছানোও জরুরি।

তিন দেশের সঙ্গে বৈঠক এবং কূটনৈতিক বার্তা

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু আলাদা হলেও মূলবার্তা একই—উত্তেজনা প্রশমন, যোগাযোগ রাখা এবং রাজনৈতিক সমাধানের আশা জিইয়ে রাখা।

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহিনের সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, বহুপক্ষীয় মঞ্চে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে চীন সক্রিয় থাকবে। তিনি শান্তিপ্রিয় দেশগুলোকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান। অন্যদিকে, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল জাইয়ানির সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীনের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।

বৈঠকগুলোতে চীনের ভূমিকা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও এসেছে নানা মহলে। এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হারজগ বেইজিংয়ের প্রস্তাব এবং উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পরিসরে ফিলিস্তিনের পক্ষে চীনের অবস্থান এবং গাজায় মানবিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় চীনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তার আগে, বেইজিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত খালদুন খলিফা আল মুবারকের সঙ্গে ওয়াং ই’র বৈঠকও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে চীনের ধারাবাহিক যোগাযোগের অংশ।

অর্থাৎ, বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা একটি বৈঠকে সীমাবদ্ধ নয় বরং আঞ্চলিক বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে শান্তির পক্ষে কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করা।

স্বার্থ নয়, শান্তিপূর্ণ সমাধান

চীনের শাংহাইয়ের ফুতান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক সান তেখাং মনে করেন, চীনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের অবস্থানকেই তুলে ধরে। তার মতে, চীন কোনো পক্ষ নেওয়া কিংবা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানেই সব সময় জোর দিতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে শাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক এবং চীন-আরব সংস্কার ও উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের মহাসচিব ওয়াং কুয়াংতাও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ধারাবাহিক বৈঠকগুলো মূলত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এগিয়ে নেওয়ার প্রতি বেইজিংয়ের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

তার মতে, চীন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপকে ন্যায়সংগত এবং টেকসই পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টাটাই চালাচ্ছে।

কূটনীতির প্রভাব কতটা?

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগের তাৎপর্য বুঝতে হলে একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়—আন্তর্জাতিক সমর্থন শান্তির পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু, সংঘাতের পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না। শুধু সংলাপের আহ্বান যথেষ্ট নয়; তার ফলাফল বাস্তবায়নের পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

এখানেই চীনের কূটনীতির সামনে সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই আছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে বেইজিং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠিত করতে পারে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য সংঘাতের পক্ষগুলোর সদিচ্ছা, কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ভবিষ্যৎ তাই কেবল কে কার পক্ষে অবস্থান নিল, তার ওপর নির্ভর করছে না; বিরোধপূর্ণ পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে কতটা বাস্তব সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে, সেটিই হবে নির্ধারক বলেও মনে করেন চীন-আরব সংস্কার ও উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের মহাসচিব ওয়াং কুয়াংতাও।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, সিএমজি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *