হোয়াইট হাউস যখন হত্যাকে খেলা ভাবে - Mati News
Tuesday, April 14

হোয়াইট হাউস যখন হত্যাকে খেলা ভাবে

লি লি, সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা, বেইজিং

কার্টুন চরিত্র স্পঞ্জবব স্কোয়ারপ্যান্টস একবিংশ শতাব্দীতে যেন এক অদ্ভুত নতুন ‘ভূমিকা’ পেয়েছে—ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উল্লাস প্রকাশ!

সম্প্রতি হোয়াইট হাউস তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে স্পঞ্জবব স্কয়ারপ্যান্টসের হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি, ভিডিও গেমের সুর এবং ইরানের ওপর বিমান হামলার বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখানো হলো পাশাপাশি। এমনকি একটি ভিডিওর ক্যাপশন ছিল—‘আবার দেখবেন?’

জনসমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে তৈরি এই প্রচারণামূলক ভিডিওগুলো তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই। অনেকের মতে, এগুলো মানুষের দুর্ভোগের প্রতি নির্লজ্জ উদাসীনতার প্রকাশ।

লিলি

ভিডিওতে ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দৃশ্যের সঙ্গে বোলিং পিন পড়ে যাওয়ার দৃশ্য পালাক্রমে দেখানো হয়। সঙ্গে ছিল ক্রীড়া ধারাভাষ্যের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। পুরো উপস্থাপনাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন দর্শকরা একটি প্রতিযোগিতামূলক খেলা দেখছে। সেখানে ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষের সংগ্রাম নেই, নেই কোনো আর্তনাদ—যুদ্ধকে যেন কেবল ‘একটি নিখুঁত আঘাত’-এর রোমাঞ্চে পরিণত করা হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মিম’ বানানোর চেষ্টা ছিল দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক সংবেদনহীনতা তৈরির প্রচেষ্টা—যাতে অপরাধবোধ ছাড়াই মানুষ উল্লাস করতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ভিডিও প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু আমেরিকান নেটিজেন এটিকে ‘জঘন্য’ বলে মন্তব্য করেন।

ইউএসসি অ্যানেনবার্গ স্কুল ফর কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম-এর প্রচারণা-বিষয়ক ইতিহাসবিদ নিকোলাস কার বলেন—এটি যুদ্ধকে ‘মিম’ বানানো এবং ‘গেমিফিকেশন’-এর একটি উদাহরণ, যা সংঘাতকে উপস্থাপনের এক ভয়াবহ পদ্ধতি।

ভিডিওটির নিচে এক নেটিজেন লিখেছেন: ‘এই আনাড়ি প্রচারণা শুধু সেনাদেরকেই লজ্জিত করে না, বরং বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় অজ্ঞতা ও বর্বরতার অর্থ কী।’

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ‘যুদ্ধের গেমিফিকেশন’ সোফায় বসে ছোট ভিডিও দেখায় অভ্যস্ত তরুণ দর্শকদের সঙ্গে যুদ্ধকক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগিক সংযোগ তৈরির চেষ্টা করে। কিন্তু এতে উত্তেজনা তৈরি হয়, সহানুভূতি নয়।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স -এর ডিন পিটার লোগে বলেন, ‘এটি যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতাকে আড়াল করে। এতে যন্ত্রণা অনুভব করা যায় না, সংঘাতের পরিণতিও দেখা যায় না।’

হোয়াইট হাউসের আরেকটি ভিডিও, যার ক্যাপশন ছিল ‘আমেরিকান জাস্টিস’, এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।  এতে ব্রেভহার্ট, টপ গান ও এল কামিনো: আ ব্রেকিং ব্যাড মুভির দৃশ্য জুড়ে লেখা হয় ‘পারফেক্ট ভিক্টরি’—যা মূলত একটি অ্যাকশন গেমের ভাষা।

এই ভিডিও নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান হলিউড অভিনেতা ও পরিচালক বেন স্টিলার। তিনি তার চলচ্চিত্রের ক্লিপ সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘যুদ্ধ কোনো চলচ্চিত্র নয়।’

ইরাক যুদ্ধের এক সাবেক সৈনিক কনর ক্রাহানও সামাজিকমাধ্যমে লিখেছেন: ‘যুদ্ধ কোনো ভিডিও গেম নয়। যুদ্ধের পরিণতি অপরিবর্তনীয়। আমরা এটাকে এত হালকাভাবে নিতে পারি না।’

অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধ করত, তখন তা প্রায়ই মূল্যবোধের এক বৃহৎ আখ্যানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হতো। কিন্তু এখন সেই আখ্যানও যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। এখন আর যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের চেষ্টা নয়—বরং সেটিকে ‘দারুণ এক ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সমালোচনার মুখে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেন, ভিডিওগুলো কেবল মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তৈরি।

তবে কিছু মার্কিন গণমাধ্যম মন্তব্য করেছে, এটি আসলে ‘মৃত্যুকে ট্র্যাফিক বোনাসে এবং ট্র্যাজেডিকে বিনোদনে পরিণত করার সক্ষমতার প্রদর্শন।’

সাম্প্রতিক ইপসস জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলাকে সমর্থন করেন। স্পঞ্জববের হাসি শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা ঢাকতে পারেনি।

যুদ্ধ কোনো সিনেমা নয়, খেলা তো নয়ই। তবু জনপ্রিয় সংস্কৃতির দৃশ্য, ভিডিও গেমের ভাষা এবং প্রচারণামূলক ভিডিওর মাধ্যমে বাস্তব সামরিক হামলাকে ‘আমেরিকান ন্যায়বিচার’-এর এক চাক্ষুষ প্রদর্শনীতে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীতে অনেক দেশ সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য সামরিক মানের কম্পিউটার গেম ব্যবহার করে। কিন্তু যখন বাস্তব যুদ্ধকে ব্লকবাস্টার সিনেমা ও গেমের ছদ্মবেশে উপস্থাপন করা হয়, তখন বিষয়টির চরিত্রই বদলে যায়।

যখন যুদ্ধের দৃশ্যগুলো ছোট ভিডিও আকারে নিউজফিডে বিড়াল-কুকুরের ভিডিও কিংবা ভাইরাল নাচের ক্লিপের পাশে দেখা যায়, তখন একটি গুরুতর আন্তর্জাতিক সংঘাত ধীরে ধীরে বিপজ্জনক এক ‘রিয়েলিটি শো’-তে পরিণত হয়।

যুদ্ধের বাস্তবতা কিন্তু অন্যরকম—এটি সন্তানহারা মায়ের কান্না, ধ্বংসস্তূপ হওয়া বাড়ি এবং একটি প্রজন্মের আজীবন ক্ষতের গল্প। আর কার্টুন শৈশবের জন্য—যুদ্ধের প্রচারের জন্য নয়।

লেখক: সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা, বেইজিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *