সাকিব সিকান্দার
জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শ্রেণিকক্ষ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একদিকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তাদের এমন একটি প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত করছে যা ভবিষ্যতে ক্রমেই আরও অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি শিশুদের এআই ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘ (ইউএন) এআই ব্যবস্থার জন্য শিশু-নিরাপত্তা সংক্রান্ত আরও কঠোর বিধি প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশ স্কুলে শিক্ষার্থীরা কখন এবং কীভাবে এআই ব্যবহার করতে পারবে, সে বিষয়ে নীতিমালা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্প্রতি জেনেভায় ‘গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগেই এআই তাদের জীবনে প্রবেশ করেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি খেলনা শিশুর হাতে পৌঁছানোর আগে আমরা পরীক্ষা করি। কিন্তু এআই তাদের পড়াশোনা, বন্ধুত্ব, এমনকি তাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যেও এর প্রভাব কী হবে সেই প্রশ্ন তোলার আগেই তা শিশুদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।‘
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষ থেকে সাধারণভাবে এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে এবং সতর্কতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করতে পারবে। তবে তার আগে শিক্ষকদের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপযুক্তভাবে এআই ব্যবহার শেখানো হবে, যাতে তারা উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
ফ্রান্সও ২০২৫ সালে একই ধরনের নীতিমালা গ্রহণ করেছে। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আনুমানিক অষ্টম শ্রেণির সমমানের ‘ফোর্তিয়েম’ থেকে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করতে পারবে। তবে তা অবশ্যই সীমিত, তত্ত্বাবধানের অধীন, ব্যাখ্যাসহ এবং শিক্ষকের নির্দেশনায় হতে হবে।
নরওয়ে জানিয়েছে, বহু বছর ধরে অতিরিক্ত পর্দানির্ভর শিক্ষা ও ডিজিটাল উপকরণের ব্যবহারের পর মৌলিক শিক্ষার মান পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এআই ব্যবহারে এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। সরকারের মতে, দেশটির স্কুলগুলোতে শিক্ষার ফলাফল এবং পড়া, লেখা ও গণনার মতো মৌলিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে। তাই এআই ও পর্দার অযাচিত ব্যবহার কমিয়ে, ছাপা বইয়ের ব্যবহার বাড়িয়ে এবং মৌলিক দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সর্বশেষ ‘ডিজিটাল এডুকেশন আউটলুক’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের ৭২ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এআই শিক্ষার্থীদের নিজেদের কাজ হিসেবে এআই-তৈরি লেখা জমা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে শিক্ষাগত সততা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
এআই যখন দৈনন্দিন জীবনের গভীরে প্রবেশ করছে, তখন শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি এ থেকে দূরে রাখা ক্রমেই অবাস্তব হয়ে উঠছে।
তবে শুধু শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বাবধানের মধ্যেই সমস্যার সমাধান সীমাবদ্ধ নয়। জেনেভায় গুতেরেস শিশুদের জন্য উন্মুক্ত সব ধরনের এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি ‘এআই চাইল্ড সেফটি প্লেজ’ বা শিশু-নিরাপত্তা অঙ্গীকার গ্রহণের আহ্বান জানান।
তার মতে, শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত যেকোনো উপাদানের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ এআই যেন শিশুদের যৌনায়িত ছবি তৈরি করতে না পারে এবং এ ধরনের বিষয়বস্তু শনাক্ত, প্রতিবেদন ও অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: সিএমজি বাংলা




















