জন্মসনদ নেই বস্তি ও পথশিশুদের অর্ধেকেরও বেশি, ব্যাহত হচ্ছে মৌলিক অধিকার - Mati News
Sunday, September 27

জন্মসনদ নেই বস্তি ও পথশিশুদের অর্ধেকেরও বেশি, ব্যাহত হচ্ছে মৌলিক অধিকার

জন্মসনদ নেই—এই একটি কাগজের অভাবই যেন বস্তি ও পথের শিশুদের জীবনে একের পর এক দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—সবক্ষেত্রেই এই সনদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু এই সাধারণ কাগজটির অভাবে তারা জীবনের প্রতিটি মোড়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের এক জরিপে দেখা গেছে, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের জন্মসনদ নেই। একই জরিপে আরও উঠে এসেছে, বস্তি এলাকার ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী শহরের ৬৬৭ পথশিশু এবং বস্তি এলাকায় বসবাসরত ১ হাজার ২৪৬টি পরিবারের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমানে শিক্ষার বাইরে রয়েছে।

জন্মসনদহীন শৈশব- রাজধানীর মিরপুর মিল্কভিটাগলি, সেকশন-৭, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঝিলপাড় বস্তিতে বসবাস বিলকিস বানুর। বয়স মাত্র ১৮ বছর। এরই মধ্যে তিন বছরের একটি সন্তান রয়েছে তার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল বিলকিসের। এত অল্প বয়সে বিয়ের কারণ জানতে চাইলে তার মুখে কোনো উত্তর নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে। যেন নিজের জীবনের এই পরিণতির কোনো ব্যাখ্যাই তার জানা নেই।

একই বস্তির ১৬ বছর বয়সী আছিয়াও জানায়, তাদের বাড়ি রংপুরে। সেখানে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ‘জন্মসনদ না থাকায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগে না’—বলতে গিয়ে আছিয়ার কথায় ফুটে ওঠে জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে বাল্যবিবাহের একটি অদৃশ্য যোগসূত্র। মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রায় ২৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা চারটি বস্তিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি।

জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনের জন্য দালালরা তাদের কাছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করে। কাগজের জটিলতায় স্কুলের বাইরে- রাজধানীর ঝিলপাড়, চলন্তিকা ও আরামবাগ বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জন্মনিবন্ধন না থাকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় বহু শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের অনেকেই মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সচিব মো. আব্দুল সামাদ বলেন, ‘যাদের বাবা নেই, মা নেই, পথশিশু, তাদেরও জন্মনিবন্ধন আমরা করছি।’ নিবন্ধনে অগ্রগতি, তবুও রয়ে গেছে বড় ঘাটতি- জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে। তবে ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়ম অনুযায়ী জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলে জন্মনিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। এ বয়সী শিশুদের জন্মসনদ রয়েছে ৪৭ শতাংশের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, কয়েক বছরে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সর্বজনীন জন্মনিবন্ধনের লক্ষ্যের তুলনায় এই হার এখনো অনেক কম। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা জরুরি।

ঠিকানা থাকলেই করা যাবে নিবন্ধন- স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মো. যাহিদ হোসেন বলেন, ঢাকায় স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও বর্তমান ঠিকানার ভিত্তিতে নিবন্ধন করা সম্ভব। ভাসমান ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের নিবন্ধন নিয়ে তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধনের জন্য বিধিবদ্ধ কিছু নিয়ম রয়েছে এবং সেগুলো অনুসরণ করেই নিবন্ধন করা হচ্ছে। তবে শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ নিবন্ধনের মূল দায়িত্ব পালন করছে। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্মনিবন্ধন রয়েছে। কারণ জন্মনিবন্ধন ছাড়া তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করা সম্ভব নয়। জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়- কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক বলেন, জন্মসনদবিহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, ‘জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার সংকট।’

জন্মসনদ না থাকলে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, সরকারি ভাতা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন অধিকার ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগকে প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও জন্মনিবন্ধন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় জন্মের পরপরই শিশুর নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে পারে না। জন্মের পর পরিবারকে আলাদা দপ্তরে গিয়ে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশে হাসপাতালে সংঘটিত জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধনের দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর দেওয়ায় তারা দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে পারছে। বাড়ি বাড়ি ক্যাম্পেইনের সুপারিশ- পরিস্থিতি উত্তরণে কারিতাস বাংলাদেশের পক্ষে সংস্থার পরিচালক (কর্মসূচি) দাউদ জীবন দাশ সরকার ও বেসরকারি সংস্থার প্রতি আহ্বান জানান। এর মধ্যে রয়েছে—পিতামাতাহীন শিশুদের জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা। এ ছাড়া শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, শিশুশ্রম বা অন্য কোনো কারণে ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা না গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এসব মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা অনেকাংশেই পিছিয়ে যাব।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ।

দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পরিমাণ বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ানো এবং আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা কখনোই বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সহায়তা হতে পারে না।

দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করাও কঠিন।

পাশাপাশি সংশোধনের আবেদনও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

এ কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিও হাতেগোনা।

তাই তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সরকারসহ আমাদের সবার নজর দিতে হবে।’

ঢাকায় কেন কম জন্মনিবন্ধন- ঢাকা বিভাগে জন্মনিবন্ধনের হার সর্বনিম্ন হওয়ার কারণ সম্পর্কে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১০-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উন্নেছা শিউলী বলেন, ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই অস্থায়ী এবং ভাড়াটিয়া।

গ্রামের বা জেলা-থানা পর্যায়ের মানুষের অধিকাংশই স্থানীয় হওয়ায় সেখানে জন্মনিবন্ধনের হার তুলনামূলক বেশি।

তিনি আরও বলেন, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে অফিসে আসা মানুষের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সেবা নিতে অফিসে স্বাগত জানানো হয়।

একটি জন্মসনদ, একটি ভবিষ্যৎ- বস্তির সরু গলি কিংবা ফুটপাতের পাশে বেড়ে ওঠা শিশুটির কাছে জন্মসনদ হয়তো একটি ছোট কাগজের টুকরো।

কারিতাসের জরিপের তথ্য বলছে, হাজার হাজার শিশুর হাতে এখনো সেই কাগজ নেই।

কেউ আবার দারিদ্র্য ও কাগজপত্রের জটিলতায় জন্মের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রান্তে পড়ে আছে।

এর অর্থ হলো—রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় প্রতিটি শিশুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা, তার অধিকার স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে একটি পরিচয় দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *