একজন মানুষ নিজের নাম লিখতে পারেন বা কাগজে স্বাক্ষর করতে পারেন—কেবল এই সক্ষমতাকে কি প্রকৃত সাক্ষরতা বলা যায়? আজকের জটিল বাস্তবতায় সাক্ষরতার সংজ্ঞাকে কেবল নাম লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা চলে না। প্রকৃত সাক্ষরতা বলতে বোঝায় পড়ে অর্থ বুঝতে পারা, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, লিখে নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার বর্তমান চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কিন্তু দাপ্তরিক এই পরিসংখ্যানের বাইরেও বড় একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে—যাঁরা সাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত, তাঁদের কতজন বাস্তবে কার্যকরভাবে পড়তে ও বুঝতে সক্ষম? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ‘মিক্স ২০২৫’ (MICS) জরিপ বলছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মৌলিক পড়ার দক্ষতা রয়েছে মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের এবং মৌলিক গণনার দক্ষতা মাত্র ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট; তাদের মাত্র ২৪ শতাংশ মৌলিক পড়তে এবং ১৮ শতাংশ মৌলিক গণনা করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ‘লার্নিং পোভার্টি’ বা শিক্ষা দারিদ্র্য বিষয়ক সতর্কবার্তাও একই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়, এই পরিসংখ্যানগুলো তারই প্রমাণ।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা কেবল সাক্ষরতার হার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু পরীক্ষার পাসের হারের সঙ্গে প্রকৃত বিদ্যার্জনের ফারাক যেমন বিস্তর, তেমনি দাপ্তরিক খাতায় সাক্ষর হওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনার উপযোগী শিক্ষা পাওয়ার দূরত্বও বিশাল। তাই এখন সময় এসেছে ‘শতভাগ কার্যকর সাক্ষরতা’ অর্জনের দিকে নজর দেওয়ার। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথাগত স্কুলকেন্দ্রিক ভাবনার বাইরে এসে প্রযুক্তির, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে ১২ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এবং স্মার্টফোন এখন অনেকের হাতের নাগালে। নিরক্ষর বা অল্পশিক্ষিত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে প্রথাগত বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও, তাঁদের হাতের স্মার্টফোনটিকে একটি ব্যক্তিগত পাঠশালায় রূপান্তর করা সম্ভব। সরকার একটি জাতীয় ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করতে পারে, যেখানে মোবাইল নম্বর দিয়ে যুক্ত হয়ে ব্যবহারকারীরা শিখতে পারবেন। এখানে কোনো ভীতিকর পরীক্ষা থাকবে না, বরং ভয়েস-ভিত্তিক আলাপচারিতা, ছবি শনাক্তকরণ এবং মৌলিক হিসাবের মাধ্যমে এআই ব্যবহারকারীর শেখার স্তর বুঝে নেবে।
এই প্ল্যাটফর্মে সবার জন্য এক ছাঁচের পাঠক্রম থাকবে না। যিনি বর্ণ চেনেন কিন্তু যুক্তাক্ষর পড়তে পারেন না, কিংবা যিনি পড়তে পারেন কিন্তু ওষুধের প্রেসক্রিপশন বা সরকারি এসএমএস বুঝতে পারেন না, তাঁদের জন্য আলাদা মডিউল থাকবে। প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের অডিও, ভিজ্যুয়াল বা ইন্টারঅ্যাকটিভ পাঠের মাধ্যমে এআই ব্যবহারকারীর উচ্চারণ সংশোধন করবে এবং অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পাঠ সাজাবে। তবে মনে রাখা জরুরি, এআই কখনো রক্ত-মাংসের শিক্ষক বা সহমর্মী মানুষের বিকল্প হতে পারে না। সাক্ষরতা কেবল তথ্য আহরণ নয়, এটি একটি মানবিক যাত্রা।
প্রযুক্তির পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক মেলবন্ধন প্রয়োজন। নব্বইয়ের দশক থেকে ইউনেসকো-স্বীকৃত ‘গণকেন্দ্র’ বা কমিউনিটি লার্নিং সেন্টারগুলো প্রান্তিক মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার যে নজির সৃষ্টি করেছে, তার সঙ্গে এআই প্রযুক্তি যুক্ত করা যেতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে ৫ থেকে ১০ জনের ছোট দল গঠন করে সপ্তাহে এক দিন স্থানীয় স্কুল, মসজিদ বা কমিউনিটি সেন্টারে অনুশীলনের ব্যবস্থা করা যায়। একজন প্রশিক্ষিত সহায়কের কাছে থাকা ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তিনি জানতে পারবেন কে কোথায় আটকে যাচ্ছেন। সেখানে সরকারি ফরম পূরণ বা ডিজিটাল সেবার আবেদনের মতো বাস্তব জীবনের কাজগুলো অনুশীলন করা হবে।
এই মডেল বাস্তবায়নে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় করে নতুন অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান কাঠামো এবং মানুষের হাতের ডিভাইস ব্যবহার করেই এটি সম্ভব। সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তির মান এবং ডেটা সুরক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবে, আর মাঠপর্যায়ে তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় কর্মীরা কাজের হাল ধরবেন। উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর দপ্তরগুলো এই পুরো প্রক্রিয়ার মনিটরিং করতে পারে।
বিশ্ব সাক্ষরতা দিবসে আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—কতজন নাগরিক একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি নিজে পড়ে বুঝতে পারেন? কতজন প্রেসক্রিপশনের সঠিক পাঠ নিতে পারেন? কিংবা কতজন লিখিত তথ্যের সহায়তায় নিজের অধিকারের পক্ষে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? কাগজে স্বাক্ষর করতে পারা নয়, বরং নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারা মানুষই প্রকৃত অর্থে সাক্ষর। শতভাগ কার্যকর সাক্ষরতার সেই কঠিন যাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, তবে কোটি মানুষের কাছে স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সহযাত্রী হয়ে উঠতে পারে।



















