বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারীদের ঐতিহাসিক অবদান, জীবন ও নেতৃত্বের ধারা সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাতারের আল-মুজাদিলাহ সেন্টার অ্যান্ড মসজিদ ফর উইমেন ‘আলফু মুসলিমাহ’ নামে একটি নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এডুকেশন সিটিতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী-বিশেষায়িত আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো ইতিহাসজুড়ে মুসলিম নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকারকে একটি যৌথ বিশ্বকোষের মাধ্যমে নথিবদ্ধ করা।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রচলিত সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হবে, যেখানে মনে করা হয় যে ইতিহাসে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারকারী মুসলিম নারীরা কেবল ব্যতিক্রমী কিছু ব্যক্তি ছিলেন। এর পরিবর্তে জ্ঞানচর্চা, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ও পরিবারে নারীদের দীর্ঘদিনের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরা হবে। আল-মুজাদিলাহর রিসার্চ ম্যানেজার ড. নাজাহ নাদি জানান, তরুণ প্রজন্মের জন্য মুসলিম নারীদের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই প্রকল্পের ধারণা এসেছে।
ড. নাজাহ নাদি বলেন, ইসলামী নেতৃত্বের মডেল ধারণকারী মুসলিম নারীদের পরিসর এতটাই বিস্তৃত যে, তাদের ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখার ধারণাটি আর টেকে না। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ‘রিআয়া’ বা দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধানের ইসলামী ধারণার আলোকে নারীদের নেতৃত্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা এবং তাদের অবদানের ইতিহাসকে সহজলভ্য করে তোলা। মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্ধেকই নারী, তাই তাদের অবদান নথিবদ্ধ করা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধির জন্য অপরিহার্য।
প্রকল্পটি ইসলামী সভ্যতাভুক্ত বিশ্বের ১১টি বিস্তৃত অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করবে। এর মধ্যে রয়েছে আরবি ও ফার্সি-প্রভাবিত অঞ্চল, তুর্কি অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ, সাব-সাহারান আফ্রিকা, মালয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন ও পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইংরেজিভাষী দেশসমূহ, মূল ভূখণ্ডের ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এমন সব নারীদের ওপর, যারা তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এবং যাদের নিয়ে একাডেমিক পরিসরে আলোচনা কম হয়েছে।
গবেষণার অংশ হিসেবে কেবল নারীদের তথ্যই নয়, বরং ঐতিহাসিক উৎসগুলোতে তাদের কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বর্ণনার পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে, তাও পর্যালোচনা করা হবে। ড. নাজাহ বলেন, আমরা শুধু জানতে চাই না যে নারীদের সম্পর্কে নথি আছে কি না, বরং তাদের নথিবদ্ধ করার প্রক্রিয়াটিও আমাদের গবেষণার বিষয়।
এই গবেষণায় ৫০০টিরও বেশি জীবনী অভিধান, পাণ্ডুলিপি, আর্কাইভ এবং সমকালীন উৎস ব্যবহার করা হবে। আলফু মুসলিমাহকে কেবল জীবনী সংকলন নয়, বরং মুসলিম নারীদের ইতিহাস নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের এই উদ্যোগে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। আবেদনকারীরা প্রকল্পের সুপারিশকৃত তালিকা থেকে অথবা নিজেদের গবেষণার ক্ষেত্র থেকে ব্যক্তিত্ব নির্বাচন করতে পারবেন। প্রতিটি প্রস্তাবনা আরবি বা ইংরেজি ভাষায় জমা দেওয়া যাবে এবং একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ তিনটি প্রস্তাবনা দিতে পারবেন।
প্রস্তাবগুলোর গবেষণাগত মান এবং প্রকল্পের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা যাচাই করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের প্রচলিত জীবনী লেখার গণ্ডি পেরিয়ে নারীদের নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকারের বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করতে হবে। একই সঙ্গে মৌখিক ইতিহাস, গল্প বলা ও ভিজ্যুয়াল উপকরণের মাধ্যমে একাডেমিক গবেষণাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই উন্মুক্ত প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার শেষ সময়সীমা ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য আল-মুজাদিলাহর নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
ড. নাজাহ নাদি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মুসলিম নারীদের অবদানের একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় নথি তৈরি হবে। এটি ইতিহাসে তাদের অবস্থান সম্পর্কে গবেষণা ও জনসাধারণের উপলব্ধিকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি দ্যা পেনিনসুলায় এবিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এছাড়াও বলেন, “মুসলিম নারীদের অবদান নতুন কোনো বিষয় নয়; নারীরা দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞান উৎপাদন ও জ্ঞান হস্তান্তর, গবেষণা, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনৈতিক জীবন এবং পরিবারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে অংশগ্রহণ করে আসছে।”। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাসের যেসব অংশ এতদিন উপেক্ষিত ছিল, এই উদ্যোগ সেসব অংশকে সামনে আনতে, নতুন প্রজন্মকে মুসলিম নারীদের অবদান ও নেতৃত্বের দীর্ঘ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে ও নিজেদের চিনতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষক ও শিক্ষাবিদদের জন্য এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বিদ্যমান ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোর ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং বহু সংখ্যক গবেষণাকে উৎসাহিত করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উন্মুক্ত প্রস্তাবনার আহ্বানটি ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বহাল থাকবে।



















