কাঁচা বয়সের পাকা রাজনীতিবিদ! - Mati News
Wednesday, October 28

কাঁচা বয়সের পাকা রাজনীতিবিদ!

আল মাসুদ (ফেসবুক থেকে)

আমার ছোট লেখা লিখতে ভালো লাগে না, আর অল্প কথায় সব কথা সবাইকে বোঝাতেও পারি না। তারপরও সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি!

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে! ১১ হাজার কোটি টাকা! অনেক টাকা। এত টাকা আমি স্বপ্নে বা কল্পনাতেও দেখি না!

কিন্তু এই দেশের রাজনীতি বা রাজনীতিবিদদের কাছে এই টাকা খুবই সামান্য টাকা! তাই আসিফ মাহমুদের ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের খবরে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই!

প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে শুধু তারাই, যাদের দল বা নেতাদের অবৈধ ইনকামের পথ বন্ধ হয়ে গেছে! এখন তারা দুর্নীতি করতে না পেরে, টাকা পাচার করতে না পেরে ক্ষোভে বা প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে গেছে!

কবি হপারহপ বলে, “ওপেনে ভাইয়া, গোপনে জান—সুযোগের অভাবে চরিত্রবান!”

খুব ছোটবেলায় শেরপুরে নানার বাড়িতে গিয়ে আমি আর কাজিনরা মিলে খেত বা মান্দা সেঁচে মাছ ধরতাম। এগুলো ছিল আমাদের নিয়মিত কাজ।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পানি সেঁচা শুরু করতাম। দুপুরের মধ্যে খেত বা মান্দা শুকিয়ে যেত। তারপর মাছ ধরতাম। আমরা পরিকল্পনা করতাম, পরিশ্রম করতাম; বৈধভাবে প্রথমে আমরাই মাছ ধরতাম।

তারপর সেখানে অপেক্ষারত ছোট ছোট বাচ্চারা ও অলস-দরিদ্র মানুষরা মাছ ধরত। এরপর আশপাশের গ্রাম থেকে ছোট ছোট পোলাপান এসে মাছ ধরত।

তারপর চলত একটা লম্বা বিরতি। পরের দিন সকালে যদি কোনো মাছ অবশিষ্ট থাকত, সেগুলো একটু উপরে বা হালকা পানিতে ভেসে উঠত। বাড়ির মেয়ে বা বউরা সেগুলো ধরে নিয়ে আসত।

এভাবে সেই খেত বা মান্দায় আর কোনো মাছ অবশিষ্ট থাকত না। যেই একটা মাছ নড়তে দেখত, সেই গিয়ে ধরে নিয়ে আসত!

বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশের অবস্থাও ছিল অনেকটা এমনই। দুর্নীতি করতে করতে, টাকা পাচার করতে করতে, অহেতুক খরচ করতে করতে বাংলাদেশকে একেবারে অর্থশূন্য করে ফেলেছিল!

সেই দলের লোকেরা বা শিষ্যরা এখন আসিফ মাহমুদের দুর্নীতি নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলতেছে! প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে! ইন্টারেস্টিং না?

একজন পোস্ট দিয়েছে, “এক টুকাইয়ের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। বাকিদের খবর না জানি কী?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একটা ছেলেকে সে টুকাই বানিয়ে দিল! অথচ সে নিজে হয়তো কোনো ভালো স্কুল-কলেজে যাওয়ার সুযোগই পায় নাই! বিশ্ববিদ্যালয় তো অনেক দূরের কথা। সুযোগ পেলে সে আলো দেখতে পেত। অন্ধের মতো পোস্ট দিত না।

মিশরের ফেরাউন এবং বাংলাদেশের ‘লেডি ফেরাউনের’ অনুসারীরা কোনোদিন তাদের নেতা বা নেত্রীর ভুল বা অপরাধ দেখবে না! ওযু ছাড়া যে তাহাজ্জুদ পড়েছে, তারা মনে করে সেগুলোও কবুল হয়েছে!

কিছু অবুঝ মানুষ এমন একটা দল বা এমন একজন নেত্রীকে সমর্থন করে, যে এই দেশকে মোটেই ভালোবাসে না; বরং তাঁর পরিবারের কেউ এই দেশে থাকে না, এই দেশের নাগরিকও নয়!

আসুন, সেই দলের কিছু একদম নিম্নপর্যায়ের সাধু-সন্ন্যাসীদের আমলনামা দেখি।

শেখ হাসিনা নিজেই সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করেছিলেন যে, তাঁর ঘরের পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম ৪০০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন এবং হেলিকপ্টার ছাড়া চলতেন না! পরবর্তীতে দুদক ও সিআইডির তদন্তে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে শতকোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য উঠে আসে বলে জানানো হয়; এসব সম্পদ অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে কামিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিবদের (এপিএস) বিরুদ্ধে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও নিয়োগ-বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং সেই টাকা দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা ও বদলি-বাণিজ্যের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে শতকোটি টাকার মালিক হন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক—এমন অভিযোগ ওঠে। তাঁর ঢাকাতেই একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, ডেইরি ফার্ম ও অসংখ্য ফ্ল্যাটের সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজউক ও কাস্টমসের একাধিক পিয়ন, ক্যাশিয়ার ও অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে ঢাকায় বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুদক।

ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও তাঁর ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেল ছিলেন মূলত স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। কিন্তু তারা হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে সিআইডির তদন্তে দাবি করা হয়েছে।

ক্যাসিনো-কাণ্ডের সময় যুবলীগের মধ্যম সারির নেতা—যেমন জিকে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া—এবং পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের বিভিন্ন নেতার বাসা ও অফিস থেকে শত কোটি টাকা নগদ ও কোটি কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়। তাদের অনেকেই ঠিকাদারি ও টেন্ডারবাজির টাকা দুবাই ও থাইল্যান্ডে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এতক্ষণ আগাছার হিসাব দিলাম। এবার একটু গাছের হিসাব দিই! আপনার চোখ কপালে উঠে যাবে!

শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিভিন্ন দেশে পাচারের অভিযোগে ১১টা মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে—এমন দাবি করা হয়েছে।

২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমান বাংলাদেশি টাকায় কত টাকা হয় জানেন? প্রায় ২৮ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা!

দুদকের হিসাবে, শেখ হাসিনা পরিবারের কয়েক হাজার কোটি টাকার ‘অবৈধ সম্পদসহ’ বড় প্রকল্পে ৮০ হাজার কোটি টাকা ও ৩০ কোটি ডলার ‘পাচারের’ মতো অভিযোগ এখনও অনুসন্ধানের তালিকায় রয়েছে।

সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর কথা বাদই দিলাম। শুধু শেখ হাসিনা এবং তাঁর পরিবার যে পরিমাণ দুর্নীতি করেছে, যত অর্থ পাচার করেছে—তার হিসাব দিতে গেলে আমার বাকি জীবন লাগবে!

এই দেশে কেউ নেতার এবং পিতার ভুল দেখে না! একজন দুর্নীতিবাজ বা ঘুষখোরের সন্তানও বাবা দিবসে পোস্ট দেয়, “আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা!”

কবি হপারহপ, তোমার বাবা একজন সৎ, দরিদ্র স্কুলমাস্টার ছিল। তোমার বাবা একটা হাবা! তোমাদের জন্য তো কিছুই করতে পারে নাই। তোমরা কই যাবা?

আসিফ মাহমুদকে আমি নির্দোষ বলছি না। তাকে সমর্থনও দিচ্ছি না। সে যদি সত্যিই দুর্নীতি করে থাকে বা অর্থ পাচার করে থাকে, তাহলে তার বিচার হোক। তবে তার মতো প্রত্যেকেরই বিচার হোক।

আইন সবার জন্য সমান। আইন শুধু দুর্বলের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার জন্য নয়।

আপনার নিজের ঘরের চালের সমস্ত টিন ফুটো। আপনি সেটা দেখেন না; অথচ ঘরের দরজা খুলে দূরের বিল্ডিংয়ের ভেন্টিলেটরের ছিদ্র দেখে বলেন, “ভেতরের লোকগুলো নিশ্চয়ই ভিজে গেছে!”

আপনার দলের একদম নিম্নপর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে প্রধান পর্যন্ত দুর্নীতি করতে করতে, টাকা পাচার করতে করতে সেটাকে নিয়মে পরিণত করে ফেলেছিল! আপনি সেটা দেখেন না। আপনি আসিফ মাহমুদের ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের খবর নিয়ে লাফাতে লাফাতে লুঙ্গি ছিড়ে ফেলছেন!

আসিফ মাহমুদ যা করেছে, ঠিকই করেছে! কী কথা শুনে মাথা ঘুরাচ্ছে? আমিও পল্টি নিলাম! নারে ভাই। আসল কথা শুনুন এবার!

এই দেশে কেউ দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্য, বা মানুষকে ভালোবেসে মানুষের জন্য রাজনীতি করে না। সবাই টাকা বা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে। আসিফ মাহমুদও তাই করেছে।

যথেষ্ট মেধাবী এবং বুদ্ধিমান ছেলে। অল্প বয়সেই সে এই দেশের রাজনীতিটা বুঝতে পেরেছে। যা অভিজ্ঞতায় চুল পাকিয়ে ফেললেও ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুঝতে পারেন নাই!

ড. ইউনূস এখন বেশি মাইনক্যা চিপায় আছেন! শুনতেছি, তাঁকে নাকি কর দিতেই হবে!

তিনি ছোটবেলায় কুমিরের বাচ্চা এবং শিয়ালের গল্প পড়েছিলেন কি না জানি না; তবে তিনি এখন সেই খেলার অংশ হয়ে গেছেন। তাঁকে নিয়ে এখন ছেলে-খেলা করা হবে, আর খেলা শেষে তাকেই সব দোষ দেওয়া হবে!

আসিফ মাহমুদ বুঝতে পেরেছিল—এই দেশের সৎ রাজনীতি তাকে কিছুই দিবে না।

সে এবং তার সহপাঠীরা মিলে যে একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, সেই কথা দেশের মানুষ এবং অন্যান্য রাজনীতিবিদরা ভুলে যাবে।

ভুলে গেছে না? এখন বরং তাদেরকেই বিভিন্নভাবে দোষী বানানো হচ্ছে এবং বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে! এই দুর্নীতির বিষয়টাও একটা ফাঁদ হতে পারে!

এই দেশের মানুষ মনে হয় আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহকে ফেরেশতা ভেবেছিল!

তারা কোনো ভুল করতে পারবে না। কোনো পাপ করতে পারবে না। বিয়ে করতে পারবে না। বউ নিয়ে কোনো কনসার্টে যেতে পারবে না। কোনো বেঠিক কথা বলতে পারবে না। কখনো বকা দিতে পারবে না। উচ্চস্বরে কথা বলতে পারবে না। কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে পারবে না। রাজনীতি করতে পারবে না। দল করতে পারবে না। নির্বাচন করতে পারবে না। এমপি হতে পারবে না—ইত্যাদি, ইত্যাদি।

তারা দেশের মানুষের ওপর চেপে থাকা একটা ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাতের জন্য আসমান থেকে নাযিল হয়েছিল এবং কাজ শেষে আবার আসমানে চলে যাবে, অথবা জমিনে ঘুমিয়ে থাকবে—এটাই মানুষ মনে করেছিল!

আর বাকিরা যা খুশি তাই করবে! কেউ কিছু বলবে না। বলতে পারবে না। বলতেও দেবে না। বললেই হয় হামলা, নয় মামলা! একই নিয়মে এবার তোরা নতুন ঠেলা সামলা!

একটা মানুষও বলে না বা চিন্তা করে না—এই ছেলেগুলো যদি ব্যর্থ হতো, তাহলে কী হতো?

প্রত্যেককে ধরে ধরে ফাঁসি দেওয়া হতো বা গুম করা হতো। তাদের পরিবারেও নেমে আসত অকথ্য, অমানবিক ও অমানুষিক নির্যাতন।

ধরুন, কোনো কারণে তারা যদি আবারও ক্ষমতায় আসে, তাহলে সত্যিই আরও হিংস্র ও আক্রমণাত্মক হয়ে আসবে! প্রত্যেককে খুঁজে খুঁজে ধরে এনে মারবে!

যারা আন্দোলন করেছে, আন্দোলনে সহযোগিতা করেছে, তারা তো প্রতিনিয়ত হুমকি পাচ্ছেই। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যখন তাদের পক্ষে কথা বলে, তাদেরকেও হুমকি দেয় সেই দলের লোকেরা! বুঝুন তাহলে অবস্থা!

এই ছেলেগুলো যে কত অপমানিত হয়েছে, কত কথা শুনেছে, কত বকা খেয়েছে, কত ট্রল সহ্য করেছে—তার কোনো হিসাব নাই। যাদের দলে একটা মোটা কালা আফ্রিকান মাগুর ছিল, তারাও হাসনাত আব্দুল্লাহকে কথায় কথায় ‘কালা পাঠা’ বলে!

লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে। কথা আর বাড়াচ্ছি না। শুধু এতটুকুই বলি—আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আসিফ মাহমুদই এই দেশের রাজনীতিটা একটু বুঝতে পেরেছে!

অন্যদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ বোকামি করতেছে। বোকামির ফল একদিন হয়তো তাকে ভোগ করতে হবে! দিনশেষে তার হিসাবের খাতায় শূন্য যোগ হবে!

এই দেশের রাজনীতিতে কেউ ফেরেশতা নয়, কেউ পাপমুক্তও নয়। কিন্তু একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যেমন তদন্ত ও বিচার চাই, তেমনি অন্যজনের বিরুদ্ধেও চাই।

১১ হাজার কোটি টাকা হোক কিংবা ২৮ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা—হিসাব যদি হয়, সবার হোক। বিচার যদি হয়, সবার হোক।

নিজের ঘরের চালের সমস্ত টিন ফুটো রেখে দূরের বাড়ির ভেন্টিলেটরের ছিদ্র গুনে লাভ কী?

রাষ্ট্রের আইন যদি সত্যিই আইন হয়, তাহলে তার চোখে দল, নেতা, পদ, পরিচয়—কিছুই বড় নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *