কর্মজীবী মানুষের চাওয়া ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট - Mati News
Tuesday, June 9

কর্মজীবী মানুষের চাওয়া ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট

স্বপন বিশ্বাস

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার কখনোই সহজে অর্জিত হয়নি; বরং তা এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং আত্মদানের মধ্য দিয়ে। সেই ইতিহাসকে সামনে রেখেই মে দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি কর্মজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায্যতার দাবি জানানোর এক দৃঢ় উচ্চারণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর।

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ,গার্মেন্টস কর্মী, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, কারখানার কর্মচারীসহ নানা খাতে নিয়োজিত কোটি মানুষের পরিশ্রমে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অগ্রযাত্রা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শ্রমজীবী মানুষেরা কি তাদের প্রাপ্য সম্মান, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাচ্ছেন?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী মানুষের প্রধান চাওয়া হচ্ছে ন্যায্য মজুরি। জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বেড়ে চলেছে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ সবকিছুরই খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মজুরি বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই হয়নি। ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও তা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় কিংবা তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নও হয় না। তাই শ্রমিকদের প্রথম ও প্রধান দাবি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা দ্বিতীয়ত, নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমজীবী মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া। বাংলাদেশে অতীতে রানা প্লাজা ধংস কিংবা তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ডের মতো মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে, কর্মস্থলে নিরাপত্তার অভাব কত ভয়াবহ হতে পারে।

যদিও এসব ঘটনার পর কিছু সংস্কার ও নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও এখনও অনেক শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা মানদণ্ড পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। শ্রমিকরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।বিশেষ করে নারী শ্রমিকের জন্য। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, বেকারত্ব বা বার্ধক্যের সময় অনেক শ্রমিকই অসহায় হয়ে পড়েন।

উন্নত দেশগুলোতে শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা বা বেকার ভাতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই ব্যবস্থাগুলো এখনও সীমিত। ফলে শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরা। তাই একটি টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া শ্রমিকদের কাজের সময় নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য যথাযথ পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। এটি শ্রম আইনের লঙ্ঘন এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী। শ্রমিকদের বিশ্রাম, বিনোদন এবং পারিবারিক জীবনের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিও শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাচ্ছে। ফলে অনেক শ্রমিক তাদের কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা পরিবর্তিত কর্মবাজারে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারেন।


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নারী শ্রমিকরা এখনও বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন।কম মজুরি, কর্মস্থলে হয়রানি, মাতৃত্বকালীন সুবিধার অভাব ইত্যাদি। তাই নারী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মে দিবসের চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠন-এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রম আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মালিকদেরও উচিত শ্রমিকদের প্রতি মানবিক ও ন্যায্য আচরণ করা। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে হতে হবে আরও সচেতন, দায়িত্বশীল এবং কার্যকর, যাতে তারা শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।


মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়। শ্রমিকরা কেবল উৎপাদনের একটি উপাদান নয়, তারা সমাজ ও অর্থনীতির প্রাণ। তাদের ঘাম, শ্রম এবং ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের উন্নয়ন। তাই তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পরিশেষে বলা যায়, মহান মে দিবস আমাদের জন্য একটি আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কতটা শ্রমিকবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। কেবল শোভাযাত্রা বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাস্তব পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নই হওয়া উচিত এই দিনের প্রকৃত প্রতিফলন। শ্রমিকের অধিকার মানে মানবাধিকারেরই স্বীকৃতি,এই বোধটি যতদিন না আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, ততদিন মে দিবসের চেতনা পূর্ণতা পাবে না।

…………..
স্বপন বিশ্বাস
কবি ও কলামিস্ট
শালিখা মাগুরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *