ধোপে টিকছে না চীনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার - Mati News
Wednesday, August 5

ধোপে টিকছে না চীনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার

লি ওয়ানলু শিশির

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশ্চিমের কিছু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ নিজেদের শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও বাজারের অবস্থান ধরে রাখতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইস্যুর রাজনীতিকীকরণ করছে। তারা চীনের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’ এবং ‘চায়না শক ২.০’-এর মতো ধারণা প্রচার করে সেগুলোকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা কী? চীনের উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আসলেই কী বার্তা নিয়ে এসেছে?

২৮ জুলাই চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘তথাকথিত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ইস্যুতে চীনের অবস্থান’ শীর্ষক একটি অবস্থানপত্র প্রকাশ করেছে। এতে বিপুল তথ্য-উপাত্ত ও উদাহরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক উৎপাদন সক্ষমতা এবং তথাকথিত ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’ প্রশ্নটিকে আরও বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’ বলতে কী বোঝায়? এর সর্বজনস্বীকৃত কোনো সংজ্ঞা নেই। সাধারণভাবে উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, তা প্রতিটি দেশের বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে মূল্যায়ন করতে হয়।

তথ্যানুযায়ী, উন্নত ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারের হার সাধারণত ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে থাকে, আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা ৫০ থেকে ৬৪ শতাংশ। বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চীন ধারাবাহিকভাবে সরবরাহের কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির নির্ধারিত আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারের হার ছিল ৭৪.৪ শতাংশ, যা যৌক্তিক পর্যায়েই রয়েছে।

তবে কিছু দেশ ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্য সুরক্ষাবাদের স্বার্থে ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’ ধারণাটিকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যাখ্যা করছে। তাদের লক্ষ্য চীনের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা এবং স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। এই প্রেক্ষাপটেই চীন প্রায় ১০ হাজার শব্দের এ অবস্থানপত্র প্রকাশ করেছে।

অবস্থানপত্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’র সঙ্গে শিল্প ভর্তুকি, বাণিজ্য উদ্বৃত্ত, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং বাজার প্রতিযোগিতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচলিত একপেশে ব্যাখ্যা ও ভুল ধারণার জবাব দেওয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, ‘শিল্প ভর্তুকির কারণেই চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে’—এমন অভিযোগের জবাবে অবস্থানপত্রে বলা হয়েছে, ভর্তুকি কোনো সমস্যা নয়; গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তা যেন উন্মুক্ততা, ন্যায্যতা ও নিয়মভিত্তিক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাঠামোর মধ্যে যৌক্তিকভাবে প্রয়োগ করা হয়।

চীনের ভর্তুকি নীতি সব ধরনের বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, পুরনো ভোগ্যপণ্য বদলে নতুন পণ্য কেনার কর্মসূচিতে দেশীয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো বৈষম্য করা হয়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলোও সমানভাবে এতে অংশগ্রহণ করেছে এবং সুবিধা পেয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের বহু শিল্পখাত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বিপুল বিনিয়োগ এবং ধারাবাহিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করেছে; কেবল সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে নয়।

আরেকটি বহুল প্রচারিত অভিযোগ হলো, চীনের পণ্য বাণিজ্যে বড় উদ্বৃত্তই নাকি ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’র প্রমাণ। অবস্থানপত্রে তথ্য ও উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, এ যুক্তিরও বাস্তব ভিত্তি নেই। একটি দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে চীন কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জনের নীতি অনুসরণ করে না। রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে যেমন রয়েছে বৃহৎ উৎপাদনের সুবিধা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, তেমনি রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সবুজ রূপান্তর ও শিল্পায়নের ক্রমবর্ধমান চাহিদা।

বাণিজ্যিক লাভের বণ্টনের দিক থেকেও দেখা যায়, উদ্বৃত্তের হিসাব চীনের হলেও এর সুফল ভাগ করে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে চীনের মোট রপ্তানির ২৭ শতাংশই ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের, আর মোট বাণিজ্য উদ্বৃত্তের ১৬ শতাংশও এসেছে তাদের মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ও মুনাফা বৃদ্ধির হার দেশীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আরও বেশি ছিল।

অন্যদিকে, সেবা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আয়ের ক্ষেত্রে চীন এখনও ঘাটতিতে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত জিডিপির প্রায় ৩.৭ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুক্তিসঙ্গত সীমার মধ্যেই আছে।

উৎপাদন সক্ষমতার ওঠানামা বাজার অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক ও গতিশীল বৈশিষ্ট্য। তাই বিষয়টিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজারের নিয়মের আলোকে বস্তুনিষ্ঠ এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা প্রয়োজন। নিজেদের কাঠামোগত সমস্যার দায় চীনের ওপর চাপিয়ে দিলে সেই সমস্যার সমাধান হবে না।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *