ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নিয়ে চীন কেন সতর্ক? - Mati News
Tuesday, July 7

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নিয়ে চীন কেন সতর্ক?

 

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

 

ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা
ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা

বাংলাদেশের বন্ধুরা, আপনারা যখন ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি বলেন, তখন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথাই স্মরণ করেন। চীনাদের কাছেও ৭ জুলাই তেমনি একটি বেদনা ও প্রতিরোধের স্মৃতিবহ দিন। ১৯৩৭ সালের এই দিনে, লুকৌছিয়াও (মার্কো পোলো সেতু)’র গুলির শব্দে চীনের জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এটি শুধু চীনের ইতিহাস নয়, বরং আগ্রাসন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এশিয়ার জনগণের যৌথ প্রতিরোধ।

আমরা আজ শান্তির যুগে বাস করছি। কিন্তু ইতিহাসের ধোঁয়া তো স্মৃতি থেকে মুছে যাবার নয়। যখনই চীনা জনগণ শোনে, জাপানের কিছু রাজনীতিক ইয়াসুকুনি মন্দিরে পূজা দিতে যাচ্ছেন, শান্তি-সংবিধান সংশোধন করতে চলেছেন, কিংবা দক্ষিণ চীন সাগরে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর চেষ্টা করছেন, সেই গভীর ব্যথা ফের জাগ্রত হয়। এই অনুভূতি ‘জাপান-বিরোধী মনোভাব’ নয়; বরং এটি একটি শোচনীয় ইতিহাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সতর্কতার বোধ।

ইতিহাসের ক্ষত: কেন সহজে ‘পাতা ওল্টানো’ যায় না?

অনেক বাংলাদেশি বন্ধু যারা পূর্ব এশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তারা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন: যুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় ৯ দশক হলো, তা হলে কেন চীনারা এখনও কেন এত সংবেদনশীল?

এর কারণ—শুধু যে ওই সময় সাড়ে তিন কোটি চীনা সেনা ও বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন তা নয়, বরং যুদ্ধোত্তর জাপান কখনই জার্মানির মতো সম্পূর্ণ আত্মসমালোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। নানচিংয়ে ৩ লাখ নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যার শিকার হয়েছিল; উত্তর-পূর্ব চীনে জীবিত মানুষের ওপর জীবাণু-অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল কুখ্যাত ‘৭৩১ ইউনিট’। মানবতাবিরোধী এ অপরাধগুলোকে বরাবরই বেশ হালকাভাবে উপস্থাপন করেছে জাপানের ডানপন্থী শক্তি। এমনকি তারা অস্বীকারও করেছে।

ধরুন একটি পরিবারের কথা, যারা সহিংসতার শিকার হয়েছে এবং বছরের পর বছর আক্রমণকারীর বংশধররা ক্ষমা তো চায়নি, বরং পারিবারিক ইতিহাস বিকৃত করে, অপরাধের প্রমাণ ধ্বংস করে আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। তো, সেই পরিবার কি তা উপেক্ষা করতে পারে? সুতরাং, জাপানি ডানপন্থীদের প্রতি চীনাদের ক্ষোভ মূলত ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ়তার প্রতিফলন।

সামরিকবাদ কি আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে?

যদি ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত তাকাই, দেখা যাবে, চীন ও অন্যান্য এশীয় প্রতিবেশীদের উদ্বেগ ভিত্তিহীন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জাপান তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে। ‘আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা’ নীতি ছেড়ে ‘শত্রু অঞ্চলের ওপর হামলার সক্ষমতা’ অর্জনের চেষ্টা করছে তারা। কিছু রাজনীতিবিদ প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘তাইওয়ানের কোনো সমস্যা হলে তা জাপানেরও সমস্যা’—এটি স্পষ্টতই চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার সামিল। এগুলো ইঙ্গিত দেয়—জাপানি সামরিকবাদের ভূত এখনও বিলীন হয়নি, বরং নতুন ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের রূপে আবার মাথা তোলার চেষ্টা করছে।

এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহন পথ এবং জনকল্যাণের সাথে জড়িত। যদি এশিয়া আবার অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতে নিমজ্জিত হয়, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি দূরবর্তী পশ্চিমা দেশগুলোর হবে না, বরং এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোরই হবে। আর বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

‘লুকৌছিয়াও ঘটনা’ কীভাবে দেখবেন? আমরা কী বার্তা দিতে চাই?

সাংবাদিক হিসেবে, কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘লুকৌছিয়াও ঘটনা’ নিয়ে লেখা যায়? আমরা শুধু দূরবর্তী ঐতিহাসিক তারিখগুলোর তালিকা দিয়েই ক্ষান্ত হতে চাই না, বরং তিনটি অর্থ তুলে ধরতে চাই—

সভ্যতা ও বর্বরতার দ্বন্দ্ব: প্রথমত, সেই যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের লড়াই ছিল না, এটি সভ্যতা বনাম বর্বরতা, ন্যায় বনাম অন্যায়ের লড়াই ছিল। ওই সময়কার চীনের প্রতিরোধ যুদ্ধটি কিন্তু বাংলাদেশের একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে চেতনাগতভাবে গভীর সাদৃশ্যপূর্ণ।

শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিহীনতা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন: দ্বিতীয়ত, জাপান যখন আগ্রাসন চালায়, তখন ‘মহা পূর্ব এশিয়া সহসমৃদ্ধি বলয়’-এর ছদ্মবেশ ব্যবহার করেছিল। আজও কিছু দেশ ‘স্বাধীন ও উন্মুক্ত’ হওয়ার নামে নতুন জোট গঠন করছে। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—যখন মিথ্যা সুন্দর আবরণে সজ্জিত হয়, তখনই তা সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

শান্তির ভঙ্গুরতা: তৃতীয়ত, শান্তি কখনও স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান থাকে না, এর জন্য ন্যায়ের শক্তির সুরক্ষা এবং ইতিহাসের স্পষ্ট জ্ঞান প্রয়োজন। চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে এ শান্তি রক্ষা করতে হয় সেটাও আমরা ভুলতে পারি না।

যৌথ ভবিষ্যত: আমরা কেমন এশিয়া চাই?

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব বিদ্যমান। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে ঢাকা মেট্রো পর্যন্ত চীনা উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জনগণের উন্নয়নে কাজ করছে। এটা সবাই উপলব্ধি করবে যে, অস্থিতিশীল এশিয়া সমস্ত উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে।

জাপানি সামরিকবাদের প্রতি চীনের এ সতর্কতা কিন্তু ঘৃণা চিরস্থায়ী করার জন্য নয়, ইতিহাসের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য। আমরা আশা করি, জাপানের তরুণ প্রজন্ম সত্য ইতিহাস জানবে, এবং আন্তর্জাতিক সমাজ ও বাংলাদেশের বন্ধুরা বুঝতে পারবে যে, একটি বিশৃঙ্খল ও বিভক্ত এশিয়া সকল এশীয়র জন্যই বিপর্যয়ের। আমরা সবাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ, ন্যায়পরায়ণ ও শান্তিপূর্ণ এশিয়া রেখে যেতে চাই।

৭ জুলাইয়ের বিশেষ দিনে, আমরা ঘৃণার স্মৃতি উদযাপন করি না; বরং যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের জন্য, অর্জিত শান্তির জন্য এক গম্ভীর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করি।

—লেখাটি বাংলাদেশের সকল শান্তিপ্রিয় বন্ধুদের প্রতি উৎসর্গ করা হলো।

লেখক: সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *