ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীর রিডিং পড়তে না পারা ও একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কৈফিয়ত তলব - Mati News
Friday, September 25

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীর রিডিং পড়তে না পারা ও একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কৈফিয়ত তলব


স্বপন বিশ্বাস

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের একটি সাধারণ অংশ সাবলীলভাবে পড়তে পারছে না। ঘটনাটি জানার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের বিষয়ে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৈফিয়ত তলব করেন। মুহূর্তেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেউ শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করেন, আবার কেউ শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমালোচনা করেন।
প্রশ্ন হলো, একটি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী কেন রিডিং পড়তে পারছে না? এটি কি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা, নাকি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বড় সংকেত?
শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো পড়া, লেখা ও বোঝার ক্ষমতা। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিক স্তর পার হওয়ার পরও পাঠ্যবইয়ের লেখা পড়ে বুঝতে না পারে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে তার শেখার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস কিংবা অন্য যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ভাষা ও পাঠদক্ষতা।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে, বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি উত্তীর্ণ হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। বিভিন্ন গবেষণা ও মূল্যায়নেও দেখা গেছে, নির্দিষ্ট শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী তাদের প্রত্যাশিত পাঠদক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই শিক্ষার্থীর ঘটনাটি তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি সম্ভবত বৃহত্তর একটি সমস্যার প্রতিফলন। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরও যদি সাবলীলভাবে পড়তে না পারে, তাহলে সেখানে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করলে হবে না। দেখতে হবে তার শেখার পরিবেশ, বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকের সক্ষমতা, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা।

তবে এ ক্ষেত্রেও আমাদের মানবিক হওয়া প্রয়োজন। একটি শিশুকে ও তার শিক্ষককে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে তার দুর্বলতাকে সবার সামনে তুলে ধরা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা ভুল করবে, পিছিয়ে পড়বে, আবার সুযোগ পেলে এগিয়েও যাবে। তাদের দুর্বলতাকে উপহাসের বিষয় বানানো কখনোই কাম্য নয়। ভাইরাল হওয়ার পর সেই শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার কথাও আমাদের ভাবতে হবে। কারণ শিক্ষার উদ্দেশ্য কাউকে লজ্জিত করা নয়, বরং তাকে শেখার সুযোগ করে দেওয়া।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কৈফিয়ত তলবের ঘটনাটি তীব্র সমালোচনায় এসেছে। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে অবশ্যই সৃজনশীলতার মধ্যে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি শিক্ষা নিয়ে সচেতন থাকেন, তাহলে জবাবদিহিতা বাড়ে। কিন্তু জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। শুধু কৈফিয়ত তলব করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষক একা কোনো শিক্ষার্থীর সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য পুরোপুরি দায়ী নন। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট রয়েছে। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হয়। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ নেই। আবার অনেক অভিভাবক কর্মব্যস্ততা বা সচেতনতার অভাবে সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে।

করোনাকালীন দীর্ঘ শিক্ষা বিরতির প্রভাবও এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেই সময়ে অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠদক্ষতা হারিয়েছে বা অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার অনেক শিশুর শেখার ক্ষতি ছিল ব্যাপক। পরবর্তীতে তারা শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও দক্ষতার ঘাটতি থেকে গেছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও এমন কোনো বাস্তবতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা প্রায়ই কোনো একটি ঘটনা দেখে তাৎক্ষণিক রায় দিয়ে দিই। কিন্তু শিক্ষার মতো জটিল বিষয়ে আবেগ নয়, প্রয়োজন গভীর বিশ্লেষণ। একটি ভিডিও হয়তো কয়েক মিনিটের বাস্তবতা দেখায়, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর পেছনে থাকে বছরের পর বছর শেখার ইতিহাস। তাই ভাইরাল ভিডিও দেখে শুধু দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষার মান উন্নয়নে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রাথমিক স্তরে পাঠদক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের শেখার মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে ঘাটতি দ্রুত শনাক্ত করা যায়। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, অভিভাবকদের আরও সম্পৃক্ত করতে হবে। সর্বোপরি, শিক্ষার্থীদের জন্য এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা ভয় নয়, আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার ওপর। তাই ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর রিডিং পড়তে না পারার ঘটনা শুধু একটি ভাইরাল সংবাদ নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আয়নায় দেখা একটি প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় যদি কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে, তাহলে সেটিকে আড়াল করার নয়, বরং সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

শিশুকে লজ্জিত করে নয়, তাকে শেখার সুযোগ দিয়ে; শিক্ষককে শুধু কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নয়, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে; আর প্রশাসনিক জবাবদিহিতার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত সংস্কারের মাধ্যমে আমরা একটি দক্ষ, মানবিক ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। ভাইরাল ভিডিওর ক্ষণস্থায়ী আলোচনার চেয়ে সেটিই হবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক কল্যাণকর।
……. স্বপন বিশ্বাস
কবি ও কলামিস্ট
শালিখা মাগুরা

মাটিনিউজে লেখা পাঠান: matinewsbd@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *