মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান
বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহানগর ঢাকা ও চট্টগ্রাম প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে মারাত্মক জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিপাতের পর অনেক রাস্তা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা পানির নিচে চলে যায়। এর ফলে যানজট, ব্যবসায়িক ক্ষতি, জনদুর্ভোগ এবং নগর জীবনে ব্যাপক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। চীনের ঝেংঝৌ শহরের অভিজ্ঞতা দেখায়, আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের মাধ্যমে এই ধরনের নগর বন্যার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন। একসময় যে এলাকাগুলো প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখত—যেমন জলাভূমি, খাল, নিচু জমি ও খোলা স্থান—তার অনেক অংশ এখন ভবন, রাস্তা ও কংক্রিটের অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমে গেছে। একই সঙ্গে অনেক খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল বা সংকুচিত হওয়ায় অল্প সময়ের অতিবৃষ্টিতেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে।
চীনের ঝেংঝৌ শহর ২০২১ সালের ভয়াবহ বন্যার পর যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, তা ঢাকা ও চট্টগ্ররের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। ঝেংঝৌ বর্তমানে Digital Twin প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যেখানে একটি শহরের ভার্চুয়াল মডেল তৈরি করে বৃষ্টিপাত, পানি প্রবাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। একই ধরনের প্রযুক্তি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যবহার করা হলে আগে থেকেই জানা সম্ভব হবে—কোন এলাকায় অতিরিক্ত পানি জমতে পারে, কোন রাস্তা বা আন্ডারপাস ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোথায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন বা জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ঢাকার ক্ষেত্রে একটি Smart Flood Management System গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রেইন সেন্সর, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক এবং স্যাটেলাইট তথ্য একত্র করে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগাম ব্যবস্থা নিতে পারবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আন্ডারপাস ও নিচু এলাকায় স্বয়ংক্রিয় পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা যেতে পারে।
চট্টগ্রামের জন্য এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ শহরটি পাহাড়, সমুদ্র এবং নিচু উপকূলীয় এলাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের কারণে সেখানে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। Digital Twin প্রযুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি পানি প্রবাহ, ভূমির ঢাল এবং নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বিত বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।
প্রযুক্তির পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে “Sponge City” বা স্পঞ্জ শহর ধারণা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এই ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো শহরকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত জমে না থেকে শোষিত, সংরক্ষিত ও পুনর্ব্যবহার করা যায়। এর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে—পানি প্রবেশযোগ্য রাস্তা, সবুজ ছাদ, রেইন গার্ডেন, কৃত্রিম জলাধার, নগর পার্ক এবং পুনরুদ্ধার করা জলাভূমি। ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার করাও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এছাড়া আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বড় ধারণক্ষমতার পানি নিষ্কাশন পাইপলাইন, শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় পানি অপসারণ ব্যবস্থা স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে শুধু বড় ড্রেন নির্মাণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; প্রয়োজন প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার।
ঝেংঝৌর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে নগর বন্যা কোনো অনিবার্য দুর্যোগ নয়। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব। ঢাকা ও চট্টগ্ররের মতো দ্রুত বর্ধনশীল শহরের জন্য এখনই স্মার্ট ও টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি আর নগরজীবনের জন্য বড় সংকট হয়ে না দাঁড়ায়।
লেখক:
রিসার্চ ফেলো
চেংচৌ বিশ্ববিদ্যালয়
চেংচৌ, হ্যনান, চীন












