
সাবিত রিজওয়ান
মরুভূমির ধূ ধূ প্রান্তরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল রোদের আলোয় ঝলমল করা এক শহর, আয়নাপুর।
শহরের চারপাশে উঁচু, পুরু কাচের দেয়াল। মাঝখানে বিশাল কাচের প্রাসাদে থাকেন শাসক। তাঁর রাজত্বে এক অদ্ভুত নিয়ম। প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই নগরের সব মানুষকে কাপড়ের টুকরো আর পরিষ্কারের তরল নিয়ে কাচের দেয়াল ঘষতে হয়। কোথাও একটুখানি ধুলো জমলেও রেহাই নেই।
শাসক বলতেন, “দেয়ালের ওপারে, ওই ধূলিঝড়ের আড়ালে ভয়ংকর এক শত্রু লুকিয়ে আছে। তারা আমাদের ওপর হামলা করার সুযোগ খুঁজছে। কাচ পরিষ্কার থাকলে আমি তাদের গতিবিধি দেখতে পাব। দেয়াল ঘোলা হয়ে গেলে কেউ টের পাওয়ার আগেই তারা শহরে ঢুকে সব ধ্বংস করে দেবে। তোদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমার।”
এই কথা শুনে মানুষ ভয়ে কাচ পরিষ্কার করত। সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনো কখনো রাতেও। তাদের নিজেদের কাজ ছিল, সংসার ছিল, ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু শাসকের আদেশ অমান্য করার সাহস কারও ছিল না।
কাচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে তারা প্রায়ই নিজেদের মুখ দেখতে পেত। ওপারে কী আছে, তা দেখার সময় কিংবা সুযোগ তাদের হতো না।
প্রাসাদের গভীরতম কক্ষে ছিল বিশাল এক আয়না। শাসক প্রায়ই সেখানে গিয়ে নিজের মুকুট ঠিক করতেন, পোশাকের ভাঁজ পরীক্ষা করতেন। তারপর প্রহরীদের দিকে তাকাতেন। কে তার দিকে কেমন চোখে তাকাল, কে কথা বলার সময় একটু থমকাল, এসব তাঁর নজর এড়াত না। একসময় তার মনে হতে লাগল, আশপাশের সবাই বুঝি তার বিরুদ্ধে কিছু একটা করছে।
এক রাতে প্রাসাদের করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি আয়নামহলে এসে দাঁড়ালেন। ঘরে অল্প আলো। হাতে ধরা প্রদীপের শিখা বাতাসে কেঁপে উঠছিল।
শাসক নিজের তলোয়ারটা খাপ থেকে বের করলেন। ঠিক তখনই আয়নার লোকটিকেও তলোয়ার হাতে দেখা গেল।
তিনি থেমে গেলেন।
লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। ওই চোখে ভয় নেই, আনুগত্য নেই। বরং এমন এক কঠিন দৃষ্টি, যেন সে বহুদিন ধরে শাসকের প্রতিটি কাজ লক্ষ করছে।
শাসক তলোয়ারের মুঠি শক্ত করলেন।
“কে তুই? আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আয়নার লোকটিও নড়ল। শাসকের হাত যতটা উঠল, তার হাতও ততটা উঠল।
“আমার দিকে তলোয়ার তুলিস!” শাসক চিৎকার করে উঠলেন। “আমারই প্রাসাদে ঢুকে আমার জায়গা নিতে এসেছিস?”
কথার কোনো জবাব এল না। শুধু প্রদীপের আলোয় লোকটার মুখ কেঁপে উঠল।
শাসক আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তলোয়ার তুলে সজোরে আঘাত করলেন আয়নার বুকে।
ঝনঝন শব্দে আয়নাটা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
শাসক কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। তারপর নিচের দিকে তাকাতেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভাঙা কাচের টুকরোয় কতগুলো মুখ! কোথাও তার চোখ, কোথাও মুকুট, কোথাও তলোয়ার হাতে তারই অবয়ব। তিনি যেদিকে যাচ্ছেন, সেদিকেই যেন একেকটা শত্রু তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।
“তোরা সবাই এখানে!”
তিনি পেছনে সরে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেলেন। দেয়ালের কাচেও নিজের মুখ দেখতে পেলেন। এবার আর বুঝতে পারলেন না, কোনটা আয়নার ভাঙা টুকরো, কোনটা দেয়াল, আর কোনটা তাঁর পিছু নেওয়া শত্রু।
তিনি প্রহরীদের ডাকতে পারতেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হলো, প্রহরীরাও নিশ্চয়ই ওই লোকগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।
“সবাইকে শেষ করব!”
তলোয়ার চালালেন সামনের কাচের ফ্রেমে। একবার, দুবার, তারপর বারবার। কাচ ভাঙার শব্দে প্রাসাদ কেঁপে উঠল। একটা প্যানেলের ধাতব আটকানি আগেই মরচে ধরে দুর্বল হয়ে ছিল। কয়েকটি আঘাতের পর সেটি খুলে গেল। ভারী প্যানেলটা বিকট শব্দে নিচে আছড়ে পড়ল।
তার ধাক্কায় পাশের ফ্রেম বেঁকে গেল। ওপরের আরেকটি প্যানেল কাত হয়ে নিচে নামতে শুরু করল। শাসক সরে যাওয়ার আগেই সেটি স্তম্ভে আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যে ভাঙা কাচ আর ধাতব ফ্রেমের শব্দে আয়নামহল ভরে গেল।
শাসক তখনো তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তারপর ছাদের একাংশ ভেঙে পড়ল।
ধুলোর মেঘ উঠল। কাচের প্যানেলগুলো একের পর এক আছড়ে পড়তে লাগল। শাসকের চিৎকার সেই শব্দের মধ্যে হারিয়ে গেল। যে প্রাসাদে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ বলে মনে করতেন, সেই প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপেই তিনি চাপা পড়ে রইলেন।
পরদিন সকালে ধূলিঝড় থামলে শহরের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কেউ কাউকে কিছু বলল না। এত দিন পরে তারা একসঙ্গে কাচের দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
প্রাসাদের একাংশ ধসে পড়েছে। কয়েক জায়গায় বাইরের দেয়ালও ভেঙে গেছে। সেই ফাঁক দিয়ে দূরের প্রান্তর দেখা যাচ্ছে।
মানুষগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কোথাও কোনো শত্রু নেই। নেই সৈন্যদল, নেই আক্রমণের প্রস্তুতি। শুধু বালু, দূরে কয়েকটা ছোট পাথুরে টিলা আর মাথার ওপর বিশাল নীল আকাশ।
একটা ছোট ছেলে ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাইরে পা বাড়াল। তার মা প্রথমে হাত ধরে টানতে গিয়েও থেমে গেলেন। ছেলেটা কয়েক পা এগিয়ে বালুর ওপর দাঁড়াল। তারপর পেছন ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল।
মা ধীরে ধীরে তার পিছু নিলেন।
তাদের দেখে আরও কয়েকজন এগিয়ে গেল। কেউ ভাঙা কাচের পাশে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ অনেক দিন পর প্রথমবারের মতো দেয়ালের ওপারের বাতাসে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করল।
শহরের মাঝখানে তখনো কাচ ভাঙার শব্দের প্রতিধ্বনি যেন রয়ে গেছে।
শাসক আর নেই। তার শত্রুও কোনো দিন ছিল না।
তবু সেই শত্রুর ভয়ে শহরের মানুষ কত বছর ধরে নিজেদেরই বন্দি করে রেখেছিল!
লেখকের জন্মস্থান: উত্তর উল্যা, ভরতখালী, সাঘাটা, গাইবান্ধা।



















