ঘুরে এলাম ক্যান্টন মেলা - Mati News
Thursday, May 21

ঘুরে এলাম ক্যান্টন মেলা

সাইফুল ইসলাম, চীন থেকে এসে

ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর চীনের কুয়াংচৌ শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্যান্টন মেলায় অংশ নিই। আমি পেশায় সাংবাদিক হলেও চা ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। বিশেষ করে চীনের পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সেই উদ্দেশ্যেই এই সফর।

২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর রাত ১০টা ১০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে রাত প্রায় ৩টায় কুয়াংচৌ বিমানবন্দরে পৌঁছাই। বিমান থেকে নেমে সুবিশাল বিমানবন্দর দেখে মন ভরে যায়। দ্রুত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেখান থেকে ট্যাক্সিতে করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হই। আগে থেকেই হোটেল বুকিং করা ছিল। প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই হোটেলে পৌঁছে যাই।

হোটেলের নাম ছিল মানকেদুন হোটেল, যা কুয়াংচৌর সানুয়ানলি মেট্রো স্টেশন এলাকার কাছে অবস্থিত। যদিও এটি একটি জেলা শহর, তবুও উন্নয়ন ও অবকাঠামোর দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে ঢাকাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সানুয়ানলি মেট্রো স্টেশনের সি-২ গেটের কাছেই কয়েকটি বাংলাদেশি হোটেল রয়েছে—যেমন রাঁধুনী, রিজিক ও ধানসিঁড়ি। সেখানে বিরিয়ানি, মাছের ঝোলসহ দেশি স্বাদের খাবার পাওয়া যায়। আশপাশে আরও বেশ কিছু হালাল ও দক্ষিণ এশীয় রেস্তোরাঁও রয়েছে।

সেখানে সকালে নাস্তা করে মেট্রো রেলে করে ক্যান্টন ফেয়ারের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেদিন ছিল মেলার শেষ দিন, সময় তখন প্রায় দুপুর ২টা। আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বিশাল এলাকা জুড়ে আয়োজন করা হয়েছে ক্যান্টন মেলা। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় রয়েছে, ইনভাইটেশন ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারে না। প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীরা পাসপোর্ট ও আমন্ত্রণপত্র দেখতে চান। সেগুলো স্ক্যান করে সঙ্গে সঙ্গে একটি আইডি কার্ড তৈরি করে হাতে তুলে দেন। এরপর মেলায় প্রবেশ করি।

মেলায় ঢুকেই চোখে পড়ে অসংখ্য আকর্ষণীয় পণ্য। বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ নিয়ামুল হক তরফদার এবং সহকর্মী সাংবাদিক শরীফ আহমদ। এছাড়াও অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা তিনজন মিলে মেলাটি ঘুরে দেখার সময় ব্যবসা নিয়ে নতুন এক অনুভূতি তৈরি হয়।

কুয়াংচৌর বিশাল প্রদর্শনী কেন্দ্রে ঢুকলেই মনে হয়—মানুষ আর পণ্যের এক বিশাল সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। এক পাশে স্মার্ট মেশিন, অন্য পাশে অটোমেটেড প্রোডাকশন লাইন। আবার কয়েক কদম এগোলেই দেখা যায় নতুন ডিজাইনের গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, কাঁচামাল, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও কৃষি যন্ত্রপাতি। যেন চোখের সামনে ভবিষ্যতের বাজার।

চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার, যা বিশ্বজুড়ে ক্যান্টন ফেয়ার নামে পরিচিত, চীনের সবচেয়ে প্রাচীন, বৃহত্তম এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাগুলোর একটি। এটি চীনের গুয়াংডং প্রদেশের কুয়াংচৌ শহরে স্থায়ীভাবে আয়োজন করা হয়।

ক্যান্টন ফেয়ার প্রতি বছর দুইবার অনুষ্ঠিত হয়—এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। এই দুই মৌসুমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে অংশ নেন নতুন পণ্য খুঁজে বের করতে, সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

মেলাটি তিনটি পৃথক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়—প্রথম পর্যায়, দ্বিতীয় পর্যায় এবং তৃতীয় পর্যায়। প্রথম পর্যায়ে মূলত ইলেকট্রনিক্স, শিল্পপণ্য এবং ভারী যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে গৃহস্থালী পণ্য, উপহার সামগ্রী ও হোম ডেকোর আইটেমের বিশাল সংগ্রহ দেখা যায়। আর তৃতীয় পর্যায়ে থাকে পোশাক, ফ্যাশন পণ্য, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রী।

প্রতিটি স্টলে নতুন উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য প্রদর্শন করা হয়। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও নতুন প্রযুক্তির পণ্য বাংলাদেশের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যান্টন ফেয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে সরাসরি নির্মাতা বা সাপ্লায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যায়। প্রয়োজনে সরাসরি কারখানা পরিদর্শন করে চাহিদামতো পণ্য কেনা যায়। এই মেলায় অংশ নিয়ে আমি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা ভবিষ্যতে ব্যবসার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। আমার অভিজ্ঞতার কথা শুনে ইতোমধ্যে অনেক ব্যবসায়ী ক্যান্টন মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী হয়েছেন।

মেলায় গিয়ে জানতে পারলাম, আগে যেখানে একটি পণ্য বাংলাদেশে আনতে মাসের পর মাস সময় লাগত, এখন সরাসরি যোগাযোগের কারণে সময় অনেক কমে গেছে। ফলে ব্যবসার পরিধিও দ্রুত বাড়ছে।

চীনের ভাষা কঠিন হলেও অনেক চীনা ব্যবসায়ী ইংরেজি বুঝতে পারেন, কেউ কেউ খুব ভালো ইংরেজি বলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি পণ্যও ক্রয় করেছি। এছাড়াও কিছু চীনা ব্যবসায়ী বাংলা ভাষাও কিছুটা বোঝেন। সেখানে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে চীনে ব্যবসা করছেন। প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতাও পাওয়া যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চীনে গিয়ে প্রতারণা করার সুযোগ খুব কম, কারণ তাদের আইন-কানুন অত্যন্ত কঠোর।

সাইফুল ইসলাম, সাংবাদিক, মৌলভীবাজার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *