মাওলানা মো: জয়নাল আবেদীন
বিয়ে চাইলেই বিয়ে করা যায় না, আর চাইলেই যে বিয়ে হয়ে যায়, তা-ও নয়। কখনো পারিবারিক বাধা, কখনো সামাজিক বিধিনিষেধ, কখনোবা মানুষের অযাচিত উপদেশ—সব মিলিয়ে জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক একটি ইচ্ছাও একসময় দুর্লভ হয়ে ওঠে।
আজকাল যখনই কোনো মেয়েকে দেখতে যাই, সবার মুখে ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন—
“এই বয়সে বিয়ে করতে এসেছেন? মাথার চুল তো প্রায় সবই পেকে গেছে! বয়স তো বেশ ভালোই মনে হচ্ছে!”
অথচ আমার বয়স এখনো আটাশের গণ্ডিও পেরোয়নি! চুলের পাক ধরেছে হয়তো সময়ের আগেই, কিন্তু জীবনের বয়স কি সত্যিই এতটা বেড়ে গেছে? নাকি সমাজের চোখে সময়ের আগেই আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে?
বিষয়টা এমন নয় যে, অতীতে বিয়ে করতে চাইনি। চেয়েছি, বহুবার চেয়েছি। কিন্তু যখনই বিয়ের কথা ভেবেছি, তখনই কেউ না কেউ এসে দাঁড়িয়েছে বাধার দেয়াল হয়ে। উপদেশের সুরে শুনিয়েছে—
“এখনই বিয়ে করে ফেলবি? সামনে তো আরও অনেক দিন পড়ে আছে!”
অথচ তখন আমার কলেজ-ইউনিভার্সিটির জীবন প্রায় শেষের পথে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় পেরিয়ে আরেকটি অধ্যায়ে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, যারা আমাকে তখন বিয়ের জন্য অপরিণত মনে করতেন, তাঁদের অনেকেই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ওঠার আগেই নিজেদের বিয়ে সেরে ফেলেছিলেন!
তখন তাঁদের বিয়ে ছিল স্বাভাবিক, আর আমার বিয়ের ইচ্ছা ছিল অপরিণত বয়সের আবদার!
কী বিচিত্র এই সমাজ! নিজের জীবনের ক্ষেত্রে যে নিয়ম প্রযোজ্য নয়, অন্যের জীবনে সেই নিয়মকেই তারা অলঙ্ঘনীয় বিধান বানিয়ে দেয়।
পরিবারের কথা, সমাজের কথা, লোকলজ্জার কথা—কত কথাই না শুনেছি! আমাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যেন এই পৃথিবীতে আমার জন্ম হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে। যেন নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বয়স, বোধ কিংবা যোগ্যতা—কোনোটাই আমার হয়নি।
এভাবেই একসময় বুঝতে শিখলাম, সমাজের গেঁড়াকলে আটকে গেলে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তটুকুও আর নিজের থাকে না।
আরেকটি অদ্ভুত সামাজিক বিধান হলো—বড় ভাই অবিবাহিত থাকতে ছোট ভাই কীভাবে বিয়ে করে! সমাজ নাকি তা মেনে নেবে না! অথচ যে মানুষটি আমাকে এই নীতিকথা শোনাতেন, তাঁর নিজের ঘরেই অবিবাহিত বড় বোন থাকতে তিনি বিয়ে করেছিলেন সবার আগে।
তখন প্রশ্ন জাগে, নিয়মগুলো কি সত্যিই নীতির ভিত্তিতে তৈরি, নাকি মানুষের সুবিধা-অসুবিধা বুঝে সেগুলোর ব্যাখ্যা বদলে যায়?
বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়নি বলে ছোট ভাইয়ের জীবন থেমে থাকবে কেন? বড় বোন অবিবাহিত বলে ছোট বোনের স্বপ্নগুলো অপেক্ষার প্রহরে বন্দী থাকবে কেন? একজনের জীবনের অনিশ্চয়তার দায় অন্যজনকে সারাজীবন বহন করতে হবে কেন?
জীবন তো কোনো সিরিয়াল নম্বর নয়, যেখানে বড়দের পর ছোটদের পালা আসবে!
আজ সময় বদলেছে, বদলেছে আমার মনও। একটা সময় বিয়ে করার প্রবল ইচ্ছা ছিল, সংসার গড়ার স্বপ্ন ছিল, নিজের জীবনে একজন সঙ্গীকে পাশে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু সেই ইচ্ছাকে বারবার পিছিয়ে দিতে দিতে আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে বিয়ের প্রতি আগের সেই আগ্রহটুকুও আর অনুভব করি না।
এখন কখনো কখনো মনে হয়, এই বয়সে বিয়ে করলে সন্তান হবে কবে, তারা বড় হবে কবে, আর জীবনের কতটা সময় পেরিয়ে গেলে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে? যদিও সন্তানকে বাবা-মায়ের উপার্জনের অবলম্বন হিসেবে দেখাই জীবনের উদ্দেশ্য নয়, তবু সময়ের স্বাভাবিক হিসাবগুলো মনে প্রশ্ন জাগায়। যে সময়টুকুতে একটি সংসার শুরু হতে পারত, সেই সময়টুকু তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না!
তাই আজ আমার উপলব্ধি—বিয়ে শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এটি সময়, মানসিক প্রস্তুতি, ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও পারস্পরিক সম্মতির বিষয়। আর এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সবার আগে সংশ্লিষ্ট দুজন মানুষের।
আমি এমন একটি সমাজ দেখতে চাই, যেখানে বড় ভাইয়ের অবিবাহিত থাকার কারণে ছোট ভাইকে অপেক্ষা করতে হবে না; বড় বোনের বিয়ে না হওয়ার কারণে ছোট বোনের জীবন থমকে থাকবে না। যেখানে অভিভাবকেরা লোকলজ্জা কিংবা সামাজিক রীতির চেয়ে সন্তানের মানসিক প্রস্তুতি, পছন্দ ও ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।
ধর্মের কথা বলে যারা মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ও বৈধ আকাঙ্ক্ষাকে বছরের পর বছর দমিয়ে রাখেন, অথচ বাস্তব সমস্যার সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখেন না, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন—ধর্মের শিক্ষা কি শুধু উপদেশ দেওয়ার জন্য, নাকি মানুষের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার জন্যও?
আমি ধর্মকে অসম্মান করতে চাই না; বরং ধর্মের নাম ব্যবহার করে মানুষের জীবনে অযথা বাধা সৃষ্টি করার প্রবণতাকেই প্রশ্ন করতে চাই। কারণ কোনো আদর্শের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল কথায় নয়, মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রয়োগেও প্রকাশ পায়।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে আজ ছোটদের একটি কথাই বলতে চাই—নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্যের অযাচিত উপদেশকে জীবনের চূড়ান্ত সত্য ভেবো না। পরিবারকে সম্মান করো, অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করো, নিজের দায়িত্ব বোঝো; কিন্তু শুধু সমাজের কথায় নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু হারিয়ে ফেলো না।
বিয়ে করার মতো মানসিক ও বাস্তব প্রস্তুতি থাকলে, উপযুক্ত জীবনসঙ্গী পাওয়া গেলে এবং দুজনের সম্মতি থাকলে অকারণে অপেক্ষা করো না।
মনে রেখো, সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আজ যে ইচ্ছাকে অবহেলা করা হচ্ছে, কাল হয়তো সেই ইচ্ছাটিই আর মনে জাগবে না।
কারণ সবচেয়ে বড় দুঃখ বিয়ে করতে না পারা নয়; সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো—একসময় যে স্বপ্নটি পূরণ করার জন্য মন ব্যাকুল ছিল, দীর্ঘদিনের বাধা আর অবহেলায় একদিন সেই স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছাটুকুও মরে যাওয়া।
আমি আজ শুধু নিজের জীবনের গল্প বলছি না; বলছি সেই সব মানুষের কথা, যারা পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে নীরবে কবর দিয়েছে, যারা সমাজের নিয়ম মানতে গিয়ে নিজের জীবনের সময় হারিয়েছে, যারা বারবার অপেক্ষা করতে করতে একদিন অপেক্ষা করার আকাঙ্ক্ষাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
আমি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কারও জীবন শুধু জন্মের ক্রম, আত্মীয়স্বজনের মতামত কিংবা লোকলজ্জার কাছে জিম্মি থাকবে না।
বড়দের প্রতি সম্মান থাকুক, কিন্তু ছোটদের জীবন যেন সেই সম্মানের বলি না হয়।
সন্তান উপযুক্ত হলে, তার মতামত ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন। কারণ বিয়ের উপযুক্ত বয়স পেরিয়ে যাওয়ার চেয়েও কখনো কখনো ভয়াবহ হলো—একটি মানুষের ভেতর থেকে বিয়ে করার ইচ্ছাটাই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
সমাজের কাছে আমার শেষ কথাটি তাই খুব সহজ—
সন্তানের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তার জীবনের সময়টুকু কেড়ে নেবেন না। কারণ সময় হারালে শুধু বয়স বাড়ে না, কখনো কখনো স্বপ্নও মরে যায়।




















